Friday, April 8, 2011

সিন্ড্রোম-ক্রিয়েন্ড্রোম

(এই লেখাটা এখনো সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে নি। তবু এখানে এই অর্ধেক অবস্থাতেই তুল দিলাম কেন জানি না। যখন যখন যেভাবে যেভাবে এটা সম্পূর্ণতার দিকে পা বাড়াতে থাকবে, তখন তখন সেই ভাবে পরিবর্তন করব। আবার বলছি, অনেকটা স্বীকারোক্তির ঢঙ্গেই না হয়, লেখাটা এই অবস্থায় থাকতেই কেন এখানে তুলে দিলাম, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই)

এইড্‌স নামটা ঘরে ঘরে চাউড় হলো ঠিক কোন সময়ে মনে নেই। সেলফোন যেমন, এখনো স্পষ্ট মনে আছে, আমার গ্র্যাজুয়েশন চলাকালীনও এতটা সর্বব্যাপী হয় নি। বলা ভালো, বি.. থার্ড ইয়ার যখন আমরা, আমার হাতেও একটা সেলফোন চলে আসলো, ওই সময় থেকেই ধীরে ধীরে মোবাইলের সর্বত্রগামিতা এমন প্রসারিত হলো। তেমনি এইড্‌স এই নামটার সাথে আপামোর জনসাধারনের পরিচিতি সম্ভবত ঘটে ওই আমরা যখন ক্লাস এইট-নাইন। মনে আছে, বায়োলজি ক্লাসে এইড্‌স নিয়ে মৌলিক কিছু জিনিস বোঝানোর সময় রোগ আর সিন্ড্রোমের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও আলোচনা করা হয়েছিল। পরীক্ষাতেও নির্ঘাত কোনো না কোনো ভাবে তা নিয়ে প্রশ্নও এসে থাকবে। disease আর syndrome

এই এত গৌরচন্দ্রিকার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তবু, ওই আমার যা স্বভাব, অপ্রয়োজনীয় একটা বাহুল্য করে বিরক্তির উদ্রেক ঘটালাম। যেটা বলবার, আত্মবিধ্বংসী একটা ভাব মনে আসা আর তার ফলে দুএকটা অদ্ভূত, উদ্ভত কাজকম্মো ঘটিয়ে ফেলাটাও বোধহয় অমনই; একটা সিন্ড্রোম। আমার ক্ষেত্রে তো বটেই। আত্মবিধ্বংসী শব্দটা লিখলেই অনুভব করা যায় কত জোর এর মধ্যে। ভীষণ শক্তিশালী শব্দ। জানি না যথার্থ প্রয়োগ হলো কি না। তবে হ্যাঁ, এর ফলে, এই সিন্ড্রোম আমার মধ্যে থাকার ফলে একেক সমইয় যে সব অবস্থার সমুখীন আমাকে হতে হয়, হতে হয়েছে, সেগুলোও নিতান্ত দুগ্ধপোষ্যজাত থাকেনি, থাকে না। একেক সময়ে এমন হয় যে বুঝতে পারছি কোনো একটা কথা বলে ফেলা আমার নিজের জন্যই খারাপ হবে, তার ফলে সমস্যায় পড়তে হবে এমন কি, সমস্যাটার ধারা-ধরণ কেমন হবে সেটাও হয়ত আন্দাজ করতে পারছি তবু সেই কথাটা বলে ফেলি। তেমন কাজটা করে বসি। আর, সেটা যে নিতান্ত অনিচ্ছায় করি, একেবারেই তা না। বরং, একটা প্রবল ইচ্ছা পেয়ে বসে। মনে হয়, এটা বেশ নিজের সাথেই একটা পরীক্ষা হবে। করেই দেখা যাক্‌ না, ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়! যেন একটা মজা, একটা খেলা। নিজের থেকে নিজেকে একটা দূরত্বে বসিয়ে, দূর থেকে নিজের উপর এই পরীক্ষার রকমসকম দেখতে চাওয়া। আখেরে হয়তো এটা একটা খেলাই। কিন্তু তার ফলে যে খেসারত দিতে হয়, নিজের উপর দিয়েই যা যা যায়, মোটেই খুব সুখকর হয় না তা। গত দশ-বারো বছরের কথা মাথায় রেখে বলে দেওয়া যায়, এর ফলে আমার জীবনের গতি প্রকৃতিই অনেক ভাবে অনেক সময়ে বদলে গেছে।

বালুরঘাটে যতদিন ছিলাম, অর্থাৎ জন্ম থেকে স্কুল শেষ হওয়া অবধি, জীবনটা বেশ নিস্তরঙ্গ ছিল। সে সময়ে ক্রিকেট ছিল, স্কুল ছিল, মুষ্টিমেয় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মাঝে মাঝে সাইকেলে করে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া ছিল। পূজার সময়ে, অবশ্যই কিছুটা বড় হবার পর, নির্জন অন্ধকার গলি খুঁজে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেটে টান মারা ছিল... এমনই টুকরোটাকরা কিছু জিনিস আর কি! মোটের উপর বেশ সরল একটা জীবন ছিল। কলকাতায় যাবার পর জীবন যে সাংঘাতিক জটিল হয়ে যায়, তা না। তবে আজকে, একটা দূরত্বে বসে দেখলে এটা অনুভব করে থাকি, কলকাতার অধ্যায়ের তুলনায় সত্যিই বালুরঘাটের জীবন অনেক সরল ছিল, আর নিস্তরঙ্গ ছিল। কেন, কখন, কীভাবে জানি না, এই আত্মবিধ্বংসী ভাবটা আমায় পেয়ে বসল। এও কি শহর কলকাতার আমাকে তার মস্ত হা-এর মধ্যে গিলে নেবারই এক পরকাশ মাত্তর? কে জানে!

আজ আমি একটা ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করছি। পিএইচডি। ফলত চাই না চাই, বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ, কনফারেন্স প্রভৃতি অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা পড়ে। সে সব জায়গায় যেমন, তেমনি বন্ধুদের সাথে মেতে ওঠা নিছক আড্ডাতেও গ্রাম-শহর নিয়ে কথা ওঠে অনেক সময়েই। গ্রাম মানেই এরকম এরকম, আর শহর মানেই এই এই চরিত্র হবেই। এমন সরলীকরণও অনেক ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। আর সেটা ঘটলে প্রথম যে মানুষটা বিরোধিতা করে, সে আমি। এমন ভাবে মোটের উপর গ্রাম আর শহরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট চিহ্নিত করে দেবার আমি সবসময়ই বিরোধী। কেননা, আমার যাপিত জীবনে গ্রাম না হলেও প্রায় গ্রামীন সমাজের অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনি কলকাতার মতন অত্যাধুনিক নাগরিক জীবনও আছে। তবু, একা একা ভাবতে বসলে মাঝে মাঝে মনে হয়, সত্যিই কি শহর বলেই এমন কিছু কিছু আমার সাথে আজ ঘটছে যেটা আমি সারাটা জীবন বালুরঘাটে কাটিয়ে দিলে কখনোই ঘটত না? এমন কিছু ভাবনা, কিছু দৃষ্টিকোণ, কিছু পদক্ষেপ, যা এই মস্ত কলকাতা শহরের ফলেই আমার যাপিত জীবনের সাথে যুক্ত হয়েছে! কোনো কোনো মানুষের সাথে বিশেষ কোনো সম্পর্কে যুক্ত হওয়া (কৌতুহল ভালো, দুটো লাইনের মাঝখানটা পড়ে ফেলার ক্ষমতাকেও আমি কদর করি। কিন্তু এইখানে সম্পর্ক বলতেই ওই একই রকম ভেবে নিলে আখেরে আপনাকে/তোমাকেই ঠকতে হবে। কেননা, ভুল ভাবছেন/ভাবছ।), একটা কোনো কথা বলে ফেলা, অনেক কিছুই জীবনে প্রথমবার করে ফেলা, ইত্যাদি তো বারবার হয়ে আসছে আমার সাথে। নিজেকে তাই প্রশ্নটার সম্মুখীন হতে দেখি মাঝে মাঝে। কিন্তু, এখনো তার কোনো সদুত্তর পাই নি। হয়তো কোনোদিনই পাব না। আর কখনোই হয়ত বুঝে উঠতে পারব না, আমার এই সিন্ড্রোমের, এই হঠাৎ হঠাৎ কেমন একটা আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠার সাথে আমার বর্ত্তমানের যাপিত নাগরিক জীবনের প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ আছে কি না।

3 comments:

  1. এসেছে...তবু কি যেন, কিভাবে যেন, বাকি থেকেই গেল। হয়ত থেকেই যাবে। দুঃখিত।

    ReplyDelete
  2. খুব যে একটা বোঝা গেল, এমনটা নয়।

    গতকাল পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল, অনেক কথা বলবার আছে, অনেক গল্প শোনানোর আছে..

    ReplyDelete

'আমিষ': ভালবাসার বিনির্মাণ

"আমিষ" ভালবাসার বিনির্মাণ   শুভ্রদীপ দাশগুপ্ত       আমিষ (২০১৯, অসমিয়া) রচনা ও নির্দেশনাঃ ভাস্কর হাজারিকা     অবশেষে ছবিটি দেখ...