স্যামুয়েল বেকেটের লেখা সেই দিগন্তসৃষ্টিকারী নাটক “ওয়েটিং ফর গোডো” (জানিনা উচ্চারণ ভুল হলো কি না; ইংরেজিতে তো Waiting for Godot) প্রথম পড়ি সম্ভবত এম.এ পড়াকালীন। এই সব লেখা পড়তে গেলে মাথায় মস্ত এক চাপ কাজ করতে থাকে, জ্ঞানত বা নিজের অজান্তেই। পৃথিবীতে সাড়া জাগানো একটা সাহিত্য সৃষ্টি; সেটা আমার হাতে, আমি পড়ছি সেই লেখা... সে কি একটুখানি ব্যাপার না কি! বেকেটের এই লেখাটা পড়তে গিয়েও সেই ব্যাপারটা ঘটে আমার সাথে। কিন্তু, অস্বীকার করতে পারব না, নাটকখানা আমার একেবারেই ভালো লাগে নি। হ্যাঁ, মনে হয়েছিল, এই লেখার মানে কি, কি প্রয়োজন এইরকম একটা কিছু লেখার! লেখাটা তো কোনোকিছুই বলল না, পাঠক হিসেবে কিছুই পৌছুল না আমার কাছে। দুটো মানুষ রোজ দেখা করছে, নানা অসংলগ্ন বিষয়ে অসংলগ্ন আলাপচারিতা করছে, আর গোডো নামের কোনো লোকের জন্য অপেক্ষা করছে। কে এই গোডো, এই দুজনের সাথে তার কি সম্পর্ক, আর কেনই বা নিজেদের আর সব কাজকম্মো ফেলে তারা এই দুজনের জন্য অপেক্ষা করছে, কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। গোটা নাটক জুড়ে, দু’দিন ব্যাপী, দু’অঙ্ক ব্যাপী, এই দীর্ঘ অপেক্ষা। মাঝে দু’তিন জন মানুষের অবতারণা ঘটছে। কিন্তু তাদের আসা এবং যাওয়া, তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, কোনো কিছুরই কোনো সুষ্পষ্ট কারণ নেই। নাট্যকারেরও কোনো মাথাব্যাথা নেই সেগুলো পরিষ্কার করে দেবার। কি অদ্ভূত, কি অনর্থক।
কিন্তু, পরবর্ত্তীকালে আবার যখন এই লেখাটার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, আমার এম.এ সিলেবাসে বা সিলেবাসের বাইরের কোনো প্রসঙ্গে, আবার করে যখন ভাবতে বসেছি লেখাটা নিয়ে, ভাবতে হয়েছে, একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছি। যেটা হয়ত বা ইউজিন আয়োনেষ্কোর “রাইনোসেরাস” বা “গণ্ডার” পড়তে গিয়েও হয়েছে। এটা ঠিক যে এই লেখাগুলো কিছু বলে না। কিছু বলে না বলতে কোনো নির্দিষ্ট গল্প গোছের কিছু পরিবেশন করে না এই লেখাগুলো। একটা নির্দিষ্ট শুরু, নির্দিষ্ট শেষ থাকে না এই নাটকগুলোর। কিন্তু, এলোমেলো ভাবে, শৃঙ্খলতাহীণতার মধ্য দিয়ে এই ধরনের নাটকগুলো অনেক কিছু বলে যায় আমাদের। আসলে, কিছু বলে না, আমাদের – শ্রোতা, পাঠক, দর্শকদের – অনেক কিছু বলায়। নিজের সাথে নিজে কোন সংলাপে মেতে উঠতে বাধ্য হই। যে সময়ে বাস করছি, যে সমাজে যাপন করছি, চলছি-ফিরছি, হাঁটছি-বসছি, রাস্তা-ঘাটে, অফিসে বা বিছানায় যে মানুষগুলোর সাথে দেখা হচ্ছে, যে আলোচনা করছি, যে কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইছি, যে কথাটা নিয়ে চায়ের দোকানে মেতে উঠতে চাইছি, সেগুলোর মানে কি, কি প্রয়োজন সে’সবের? প্রতিদিন যা করছি, আখেরে সেগুলোর অর্থ কি? দিনের শেষে কি বলে সেগুলো? আদৌ কি কিছু বলে? তখন মনে হতে থাকে, একটা ওয়েটিং ফর গোডো বা গণ্ডার তো আসলে আমাদের প্রাত্যহিককেই তুলে ধরছে, আমার সময়, আমার যাপন, তার যে অন্তঃসারশূণ্যতা, সেই শুন্যই তো এখানে ফুতে উঠছে। জানি না এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে কি না, কিন্তু মার্কিন তথ্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল মুরের (যাঁর ৯/১১ জর্জ বুশ জুনিয়রের মার্কিন সরকারকে বেজায় অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল) একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। এই ৯/১১ তথ্যচিত্রটি অস্কার জিতলে মুর পুরষ্কার নিতে মঞ্চে উঠে অনেকটা এরকম কিছু বলেছিলেন – I deal in non-fiction at a time when the fictitious head of a fictitious nation attack some fictitious state under some fictitious pretext…
(দাবী করছি না যে আমি এখানে মুরকে কোট করলাম, কিন্তু তাঁর বক্তব্য এই ছিল।)
No comments:
Post a Comment