Saturday, April 23, 2011

গোলাপ, যে নামেই ডাকো (!)

আমার বাড়ি বালুরঘাটে। এটা ঠিক যে সেই ২০০১ সালের প্রায় গোড়া থেকে যেই শহরে বাস করছি, সেই কলকাতা শহরও আমার অজান্তেই কখন যেন আমার শহর হয়ে উঠেছে (হয়তো বলা ভালো আমারও শহর)। তবু বাড়ি কোথায় এর উত্তরে আজও বালুরঘাটের নামটাই মুখে চলে আসে। অবশ্য এতে আমার কোনো আক্ষেপ বা ওই গোছের কোনো ইস্‌-সূচক অনুভূতি নেই। যে শহরে জন্মেছি, একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছি, পড়াশোনা, খেলাধুলার শহর তো সেই বালুরঘাটই। প্রথম কত কিছুর নামই তো বালুরঘাট। অতএব আমার বাড়ি ভাবতেই প্রথমে বালুরঘাটের কথা মনে আসা একশো শতাংশ জাস্টিফায়েড বলেই আমার বিশ্বাস। তো, কলকাতার প্রথম বছরগুলোতে যাদবপুরের লোকজন বা কলকাতার যে এলাকায় আমার বাস সেই নেতাজীনগরের অনেককেই বালুরঘাট ঠিক কোথায় বোঝাতে অনেক কসরতের পাশাপাশি বলতাম উত্তরবঙ্গের একটা ছোট শহর। অথচ উত্তরবঙ্গ বলতেই লোকে যা যা ভেবে-বুঝে থাকে বালুরঘাটে না সেই পাহাড় আছে, না আছে ডুয়ার্সের বিখ্যাত জঙ্গল। সমতলে নিতান্তই শান্তশিষ্ট এক ছোট শহর এই বালুরঘাট। বলা ভালো মধ্যবঙ্গের অংশ। নেহাত ফারাক্কার উত্তর দিকের যাবতীয় বাংলাকেই উত্তরবঙ্গের একটা ব্র্যাকেটে ফেলে দেওয়া হয়, সেই সূত্রেই বালুরঘাট নর্থ বেঙ্গল

তো আমি সেই নর্থ বেঙ্গলের মানুষ হলেও আজ অবধি কলকাতা তথা দক্ষিণবঙ্গের যাবতীয় মানুষের কাছে নর্থ বেঙ্গলের পরিচায়ক দার্জিলিং দেখি নি। দার্জিলিং দেখা তো দূরের কথা, কোনোদিন পাহাড়ে একটা রাত্রি অবধি কাটাই নি। আমার পাহাড় দর্শন বলতে খানিক মিরিক আর ইতিউতি সেবক, ইত্যাদি। সেটাও শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে সকালে ঘুরতে বেড়িয়ে বিকেলে আবার শিলিগুড়ি ফিরে আসা। এভাবে খুচরো পাহাড় বেড়াতে যাওয়া আমার প্রথম হয় ২০০৪ কিম্বা ২০০৫ সালে। সেবার সেবক হয়ে মিরিক গেছিলাম। সময়টা সম্ভবত অক্টোবর মাস। পাহাড়ে উঠতে উঠতে একটু একটু করে ঠান্ডা হাওয়া। মিরিকের সেই অদ্ভূত সুন্দর, শান্ত ঝিল, একপাশ দিয়ে পাহাড় উঠে গেছে...

আমাদের গাড়িটা যখন ক্রমশ পাহাড়ে চড়ছে, প্রথম দেখলাম একটা বড় সাইনবোর্ডে লেখা গোর্খা হিল কাউন্সিল আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে গোছের একটা লেখা (এতকাল পরেও দিব্য বলতে পারি, ওই লেখাটা আমার ভিতরে কি যেন একটা করছিল)। প্রতি মুহূর্তেই আশেপাশের ছবি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। প্রতি কিলোমিটারেই যেন তাপমাত্রা কমছিল আর সাথে সাথে রাস্তার দুধারের দৃশ্য বদল। পথের পাশে পাশে জংলী গাছগুলোয় উজ্জ্বল বর্ণের সমস্ত ফুল, হঠাৎ হঠাৎ দুএকটা বাড়িঘর আর স্থানীয় মানুষের মুখ। সবকিছুই বড্ড অচেনা লাগছিল। বড্ড অপরিচিত। কিছুতেই আমার চেনা, আমার জানা মানুষজন, ঘরবাড়ি, গাছপালা এগুলো নয়। সবই আলাদা। সবই অনেক অন্যরকম। আর, শেষমেষ মিরিকে যখন পৌছলাম, ভাবতে বাধ্য হলাম কি করে এটা পশ্চিমবঙ্গের অংশ হতে পারে? এই যে মানুষগুলো, তাদের কথাবার্তা, আচার আচরণ, ইত্যাদি; আশেপাশের এই যে দৃশ্যাবলী, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, গাছপালা, ফুল সবই যে আমার চেনা আমার জানা বাঙ্গালীত্ব থেকে ভীষন ভীষন আলাদা! অথচ এটা পশ্চিমবঙ্গ। কথায় কথায় বিচ্ছিন্নতাবাদী স্লোগান তোলার পক্ষপাতি আমি নই। আর, আজ অবধি নিজেকে এটা বিশ্বাসও করাতে পারি নি যে আলাদা গোর্খাল্যান্ড হয়ে গেলেই পাহাড়ের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু, নিজের কাছে অন্তত সৎ হতে গেলে আমি বলতে বাধ্য যে ওই কোনো এক অক্টোবরের কোনো এক দিনে জীবনে প্রথমবার পাহাড়ের অভিজ্ঞতা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল এই অঞ্চলগুলোকে পশ্চিমবঙ্গের অংশ ভাবা বা রাজনৈতিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গের অংশ করে রাখা আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না।

আজ যখন বেশ কয়েক বছর ধরে এই পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবী (এখন বিমল গুরুং-দের G.J.M অর্থাৎ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এই আন্দোলন চালাচ্ছে। সেই ২০০৪ সালে সুবাস ঘিসিং-এর সেই G.N.L.F-ই ক্ষমাতাসীন ছিল) এবং তাকে ঘিরে যথেচ্ছ রাজনীতি চলছে, হঠাৎ করে এই সব মনে পড়ে যাওয়া (আর ব্লগের পাতায় ছাইপাশ কি সব লিখে ফেলা) আর তাকে ঘিরে আরো কিছু কথা মনে আসা হয়তো খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আচ্ছা, এই মানুষগুলো কারা? কি পরিচয় এই গোর্খাদের? আমি, আর আমার মতন মানুষেরা কি জানে, কতটা জানে এদের সম্পর্কে?

আগেই উল্লেখ করেছি, আমার বর্তমান ঠিকানা কলকাতা। যে ফ্ল্যাটবাড়িতে আমি থাকি, সেখানে আমার ঠিক নিচের তলায় একটা পরিবার আছে, দরজায় তিনখানা নাম লেখা XXX রাই, YYY রাই, ZZZ গাট্টানি। সিঁড়িতে উঠতে নামতে দেখা হয়ে গেলে যেটুকু সৌজন্যমূলক বাক্যালাপ, এর বাইরে কোনোদিন তাদের সাথে কোনো কথা আমার হয় নি। তবে, তাদের দেখে, তাদের চেহারা, গড়ন দেখে, আর দরজায় তাদের নামের পদবী দেখে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় নি যে এঁরা গোর্খা। গোর্খা যাঁরা সুদূর অতীতে নেপাল অঞ্চল থেকে দক্ষিণে বর্তমানের দার্জিলিং জেলায় বসবাস শুরু করে। এটা ঠিক যে কোনো এক সময়ে তাঁরা নেপালের বাসিন্দা ছিল। কিন্তু, ইতিহাস বলে, সে তো অনেক অনেক কাল আগের কথা। আর, এই গোর্খা নামটার ব্যবহারই তো এই মানুষগুলোকে নেপালের বাসিন্দাদের থেকে আলাদা করে। অথচ এক্ষুনি রাস্তায় গিয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলবে এরা নেপালী। এরা ভারতের বৈধ নাগরিক, এদের বাপ-ঠাকুর্দারাও ভারতের নাগরিক (আর হ্যাঁ, মা-ঠাকুমা-দিদিমাও)। অথচ পথ চলতি যে কেউ এদের দেখলেই নেপালী বলবে। আর এটা এই গোর্খাদের কাছেও এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এক সময় আমাকে নিজে একজন গোর্খার সাথে রীতিমত তর্ক করে বোঝাতে হয়েছিল কেন তাকে নেপালী বলাটা অনুচিত, কেন তাকে গোর্খাই বলাটা ঠিক। আলাদা রাজ্যের দাবী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবী হয়তো ঠিক না, কিন্তু এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোও কি একটু অস্বাভাবিক না?

আমার বিশ্বাস আমার পাঠিকা/পাঠক আমার সাথে অন্তত এই ব্যাপারে একমত হবেন যে এটা অস্বাভাবিক। দেশের কিছু মানুষকে একটা প্রতিবেশি রাষ্ট্রের বাসিন্দাদের নামে চিহ্নিত করা কখনোই স্বাভাবিক হতে পারে না। আসলে আমরা সেটাকেই স্বাভাবিক বলে জেনে-বুঝে আসি যেটা সমাজে প্রতিদিন ঘটছে। তাই ফসলের মাঠে ধানের গোড়ায় রক্তের দাগ আজ স্বাভাবিক। এক বাজার মানুষের মধ্যে একজন বৃদ্ধ মানুষের বিনা চিকিৎসায় পড়ে থেকে থেকে মরে যাওয়াটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক। হঠাৎ হঠাৎ রাতবিরেতে পাশের বাড়ি থেকে কোনো নারীর আর্ত চিৎকার ভেসে আসাটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক। এ তো সমাজে আকছার ঘটছে। তাই স্বাভাবিক। ঠিক তেমন ভাবেই এই ভীষণ অস্বাভাভিক, অন্যায় একটা ব্যাপার, আমাদেরই দেশের, আমারই রাজ্যের কিছু মানুষকে হঠাৎ করে নেপালী নামে চিহ্নিত করাটাও কেমন যেন স্বাভাবিক করে নেওয়া হয়েছে। আর, এই ধরনের যাবতীয় স্বাভাবিকিকরণের মাধ্যমে এই মানুষগুলোকে প্রান্তিকায়িত করতে করতে যখন তারা একসময় আর এই স্বাভাবিককে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, গর্জে ওঠে, শহর কলকাতায় বাবু-বিবিরা তখন কোন এক অদ্ভূত দেশপ্রেম, অদ্ভূত জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দেন। আর তা নিয়ে শুরু হয় আরেক দফা ক্লেদাক্ত খেলা অধুনা যার নাম দেওয়া হয়েছে রাজনীতি।

No comments:

Post a Comment

'আমিষ': ভালবাসার বিনির্মাণ

"আমিষ" ভালবাসার বিনির্মাণ   শুভ্রদীপ দাশগুপ্ত       আমিষ (২০১৯, অসমিয়া) রচনা ও নির্দেশনাঃ ভাস্কর হাজারিকা     অবশেষে ছবিটি দেখ...