Saturday, April 30, 2011

একটা ছায়া আর ছবি


উপরের এই ছবিটা খুব একটা পরিচিত নয় বলেই আমার ধারণা। অন্তত আমার ব্লগ যাঁরা পড়ছেন বা পড়ে থাকেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই সম্ভবত এই ছবিটা, ছবির মানুষ দুজন, সম্পূর্ণই অপরিচিত। আসলে এটা একটা ফিল্মের থেকে নেওয়া স্টিল। একটা ফিল্মের দৃশ্য। ইউরোপীয়, স্প্যানিশ ফিল্ম Diario de una Nimfómana। আমার মত স্প্যানিশ-অজ্ঞ মানুষের জন্য, ইংরেজিতে, Diary of a Nymphomaniac। বলা বাহুল্য, এই ফিল্মটা আমি ইংরেজি সাবটাইটেলে দেখি। নাম শুনে মনে হতেই পারে পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম - নিম্ফোম্যানিয়াক। সে ক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, তাত্ত্বিকেরা পর্ণোগ্রাফির হয়ত বহুল বিস্তৃত সংজ্ঞা-ব্যাঞ্জনা তৈরী করে রেখেছেন, কিন্তু সাধারণত, সাধারণ মানুষ পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম বলতে যা বুঝে থাকে, এই ডায়েরি অফ্‌ আ নিম্ফোম্যানিয়াক কিন্তু তা নয়। বরং নারীবাদের ইতিহাসে পর্ণোগ্রাফি বিরোধী আন্দোলন ঘটে যাবার পরে নব্য তত্ত্বায়নে এই ডায়েরি-কে বরং 'ইরোটিকা'র পর্যায়ে ফেলা যেতে পারে (যদিও আমি এই নামকরণ, বর্গীকরণ নিয়ে তেমন ভাবিত নই)। ফিল্মটায় এমন অনেক দৃশ্য-মুহূর্ত আছে যা হয়ত কারো লিবিডো চরিতার্থ করবে, কিন্তু এই ডায়েরি অফ্‌ আ নিম্ফোম্যানিয়াক আরো কিছু, আরো অনেক কিছু, অন্য অনেক কিছু। ফিল্মটার বিষয়বস্তু কি তা নিয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে রাজি নই। ছবিটা দিয়ে লেখা শুরু করেছি, কেবল সেটাকে ঘিরে দুচার কথা বলাই আমার উদ্দেশ্য।

ছবিটায় একজন ঠাকুমা আর তার নাতনি। এই নাতনিই ফিল্মটার মুখ্য চরিত্র; তাকে ঘিরেই সমস্ত কিছু আবর্তিত হয়। ফিল্মে এই দৃশ্যের কিছু পরেই ঠাকুমা মারা যান। আর, মেয়েটি অনুভব করে একমাত্র মানুষ যে আমায় বুঝত তাকে সে হারিয়ে ফেলল। হ্যাঁ। পৃথিবী মেয়েটিকে বুঝতে ব্যার্থ হয়। তাঁর অফিস, বন্ধুবর্গ, প্রেমিকেরা (অথবা সেই সব পুরুষ যারা তাঁর জীবনে আসে, সম্পর্ক তৈরী হয়, সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়...) সবাই ব্যার্থ। কেউই তাকে জেনে উঠতে পারে না, বুঝতে পারে না। আর, ফিল্মটা যেখানে শেষ হচ্ছে একটা লং শট, মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে, আস্তে আস্তে ডিসল্ভ হয়ে যাচ্ছে এন্ড-রোলে আমরা বুঝতে পারি, আরো একবার, এই পৃথিবী মেয়েটি কে বুঝতে ব্যর্থ হতে বাধ্য। আর তার কারণ হলো সে একজন নারী। সে একজন নারীর মতো করে ভালবাসে, সে একজন নারীর মতো করে চায়। তাঁর যাপন, তাঁর ভাবনার ধারা সবই একজন নারীর মতো করে। সমস্ত ফিল্ম জুড়ে যেন এই শেষের মুহূর্তটার জমিই তৈরী করা হয়। আর এভাবেই, নিজের মতো করে ফিল্মটি নিজেকে ওই feminism of sameness থেকে উত্তীর্ণ করে, লিঙ্গহীণ, ইতিহাসহীণ, চিরন্তন, অখন্ড মানবতা-র গড়ে তোলা ধারণা থেকে সরিয়ে নিয়ে, নির্দেশ করে এক পৃথগতার দিকে।

আরেকবার ছবিটায় ফিরে যাওয়া : মেয়েটি জীবনে শেষবারের মতো তাঁর ঠাকুমার হাত নিজের হাতে নিয়ে বসে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই বৃদ্ধা মারা যাবেন, আকস্মিক ভাবে। এই সেই ঠাকুমা, যে এক সময়ে মেয়েটিকে বলেছিল যে এই পৃথিবী অফিস-কাছারি-ব্যাবসা প্রভৃতি না করা কোনো নারীর জন্য দুটো ভূমিকা নির্দিষ্ট করে রেখেছে বিয়ে আর বেশ্যাবৃত্তি। তাঁর সাথে সাথে তিনি এটাও উল্লেখ করেন অবশ্য এই দুয়ের মধ্যে খুব একটা ফারাক্‌ নেই। নাতনির করা এক প্রশ্নের উত্তরে যখন তিনি জানান যে তাঁর জীবনে মেয়েটির ঠাকুর্দা ছাড়া আর কোনো পুরুষ কোনোদিনও আসে নি, সাথে এটা জানাতে ভোলেন না যে তিনি নিজেও ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর ধীরে ধীরে, বিয়ের পর, ওই পুরুষটিকে তিনি ভালবাসতে শিখে নিয়েছিলেন। আর তাই বার বার নিজের নাতনির প্রতি তাঁর যেন নির্দেশ নিজের মতো করে জীবনটা বাঁচো। নিজের মতো করে। বার বার, বিভিন্ন ভাবে বলা এই কথাগুলো গেঁথে যায় মেয়েটির মনে। সে পারে না এই নিজের মতো করে বাঁচোকে উপেক্ষা করতে। এভাবেই হয়তো তিনি এই নাতনির কাছ থেকে তাঁর একটা সুস্থ, স্বাভাবিক, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের সুযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন। হ্যাঁ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই পৃথিবীতে এমন একজন মেয়ে নেই, যে একই সাথে নিজের মতো করে, একজন নারী হিসেবে তাঁর পৃথিবীটাকে দেখার উপর ভিত্তি করে, যাপন করে ওই আমরা যাকে সুস্থ-স্বাভাবিক-সুখী জীবন বলে থাকি, সেটা পেয়েছে। এটা সম্ভব না। উল্লেখ্য, এখানে নারী বলতে আমি ওই চলতি ধারণার (কেন্দ্রে অবস্থান করা পুরুষের) অপর অংশ বুঝছি না। নারী বলতে নারীই বুঝছি। নারী, যাকে ভেঙ্গে নিয়ে, সরলিকরণ ঘটিয়ে পুরুষের সাপেক্ষে দেখতে চাওয়া আদতে নারী থেকে অন্য কিছু একটা করে নিয়ে সেই অন্য কিছুকে দেখা; নারীকে নয়।

...

এখানেও স্বভাব-বিরোধী, স্ববিরোধী, না হয়ে হুট করে থেমে যাচ্ছি। পাঠিকা/পাঠকের অনেক অভিযোগ থাকতেই পারে। লেখাটা, আবারও, বড্ড ছড়ানো-ছিটানো হল। জানি। তবু, অপারগ এই আমি...



১। আমরা জানি এই নিম্ফোম্যানিয়াক শব্দটা প্রাত্যহিক জীবনে ঠিক কী অর্থে ব্যবহার হয়। এটা একটা ঋণাত্বক শব্দ। আজকের চলতি বাংলায় যেমন বেশ্যা, খানকি, রেন্ডি শব্দগুলো গালি হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে, তেমনি ইংরাজিতে এই নিম্ফোম্যানিয়াক শব্দের ব্যবহার। ফিল্মটির একদম শুরুর দৃশ্যেই ঠাকুমা আর নাতনির এক কথোপকথন আছে। সেখানে মেয়েটি এক জায়গায় বলছে একজন পুরুষের অদম্য যৌন চাহিদা থাকলে তাকে বাহ্‌বা দেওয়া হয়, macho বলা হয়। সেটা তার দুর্দান্ত পৌরুষের পরিচায়ক হয়ে ওঠে। আর ঠিক একই জিনিস কোনো মেয়ের মধ্যে থাকলে সমাজ তাকে সাথে সাথে বেশ্যা, slut, বলে গালিগালাজ করবে। এই সমাজই আবার সাম্যের কথা বলে বেড়ায়। ঠাকুমার উত্তর ছোট সমাজ কথা কম বলে বেশী বেশী ভালবাসলে, আদর করলে, ভালো হত।

২। ফিল্মটির আসল নাম ডায়েরি অফ্‌ আ নিম্ফোম্যানিয়াক নয়। স্প্যানিশ Diario de una Nimfómana-র অনুবাদ মাত্র। তবু এই অনূদিত নামই আমার এই লেখায় ব্যবহার করছি। আসলে, আগেই বলা হয়েছে, ফিল্মটি আমি ইংরেজি সাবটাইটেলে দেখি। মুখ্যু-সুখ্যু মনিষ্যি তাই ওই ইংরেজি নামের সাথেই বেশী আইডেন্টিফাই করতে পারছি এখানে।

৩। ফিল্মের গপ্পো এভাবে লিখে বা বলে দেওয়ায় এক মস্ত অসুবিধে আছে বলে আমার ধারণা। কথা বলা, লেখা এগুলো যেমন একেকটা মাধ্যম, সিনেমাও তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা মাধ্যম। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মাধ্যম। ফিল্মের গপ্পো জানতে হলে সেই ফিল্মটি দেখে ফেলাই শ্রেয় বলে আমার ধারণা।

৪। জানি না অপ্রাসঙ্গিক কিনা, কিন্তু এই ক্ষেত্রে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বিভিন্ন বক্তৃতায় করা এক উক্তি খুব মনে পড়ছে। স্পিভাক বারবার জোর দিয়ে এটা বলে থাকেন যে আমাদের এই পৃথিবীতে মেয়েরা বিয়ে করে না, তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। ওনাকে উদ্ধৃত করলে “women don’t marry, they are given away in marriage”

Saturday, April 23, 2011

গোলাপ, যে নামেই ডাকো (!)

আমার বাড়ি বালুরঘাটে। এটা ঠিক যে সেই ২০০১ সালের প্রায় গোড়া থেকে যেই শহরে বাস করছি, সেই কলকাতা শহরও আমার অজান্তেই কখন যেন আমার শহর হয়ে উঠেছে (হয়তো বলা ভালো আমারও শহর)। তবু বাড়ি কোথায় এর উত্তরে আজও বালুরঘাটের নামটাই মুখে চলে আসে। অবশ্য এতে আমার কোনো আক্ষেপ বা ওই গোছের কোনো ইস্‌-সূচক অনুভূতি নেই। যে শহরে জন্মেছি, একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছি, পড়াশোনা, খেলাধুলার শহর তো সেই বালুরঘাটই। প্রথম কত কিছুর নামই তো বালুরঘাট। অতএব আমার বাড়ি ভাবতেই প্রথমে বালুরঘাটের কথা মনে আসা একশো শতাংশ জাস্টিফায়েড বলেই আমার বিশ্বাস। তো, কলকাতার প্রথম বছরগুলোতে যাদবপুরের লোকজন বা কলকাতার যে এলাকায় আমার বাস সেই নেতাজীনগরের অনেককেই বালুরঘাট ঠিক কোথায় বোঝাতে অনেক কসরতের পাশাপাশি বলতাম উত্তরবঙ্গের একটা ছোট শহর। অথচ উত্তরবঙ্গ বলতেই লোকে যা যা ভেবে-বুঝে থাকে বালুরঘাটে না সেই পাহাড় আছে, না আছে ডুয়ার্সের বিখ্যাত জঙ্গল। সমতলে নিতান্তই শান্তশিষ্ট এক ছোট শহর এই বালুরঘাট। বলা ভালো মধ্যবঙ্গের অংশ। নেহাত ফারাক্কার উত্তর দিকের যাবতীয় বাংলাকেই উত্তরবঙ্গের একটা ব্র্যাকেটে ফেলে দেওয়া হয়, সেই সূত্রেই বালুরঘাট নর্থ বেঙ্গল

তো আমি সেই নর্থ বেঙ্গলের মানুষ হলেও আজ অবধি কলকাতা তথা দক্ষিণবঙ্গের যাবতীয় মানুষের কাছে নর্থ বেঙ্গলের পরিচায়ক দার্জিলিং দেখি নি। দার্জিলিং দেখা তো দূরের কথা, কোনোদিন পাহাড়ে একটা রাত্রি অবধি কাটাই নি। আমার পাহাড় দর্শন বলতে খানিক মিরিক আর ইতিউতি সেবক, ইত্যাদি। সেটাও শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে সকালে ঘুরতে বেড়িয়ে বিকেলে আবার শিলিগুড়ি ফিরে আসা। এভাবে খুচরো পাহাড় বেড়াতে যাওয়া আমার প্রথম হয় ২০০৪ কিম্বা ২০০৫ সালে। সেবার সেবক হয়ে মিরিক গেছিলাম। সময়টা সম্ভবত অক্টোবর মাস। পাহাড়ে উঠতে উঠতে একটু একটু করে ঠান্ডা হাওয়া। মিরিকের সেই অদ্ভূত সুন্দর, শান্ত ঝিল, একপাশ দিয়ে পাহাড় উঠে গেছে...

আমাদের গাড়িটা যখন ক্রমশ পাহাড়ে চড়ছে, প্রথম দেখলাম একটা বড় সাইনবোর্ডে লেখা গোর্খা হিল কাউন্সিল আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে গোছের একটা লেখা (এতকাল পরেও দিব্য বলতে পারি, ওই লেখাটা আমার ভিতরে কি যেন একটা করছিল)। প্রতি মুহূর্তেই আশেপাশের ছবি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। প্রতি কিলোমিটারেই যেন তাপমাত্রা কমছিল আর সাথে সাথে রাস্তার দুধারের দৃশ্য বদল। পথের পাশে পাশে জংলী গাছগুলোয় উজ্জ্বল বর্ণের সমস্ত ফুল, হঠাৎ হঠাৎ দুএকটা বাড়িঘর আর স্থানীয় মানুষের মুখ। সবকিছুই বড্ড অচেনা লাগছিল। বড্ড অপরিচিত। কিছুতেই আমার চেনা, আমার জানা মানুষজন, ঘরবাড়ি, গাছপালা এগুলো নয়। সবই আলাদা। সবই অনেক অন্যরকম। আর, শেষমেষ মিরিকে যখন পৌছলাম, ভাবতে বাধ্য হলাম কি করে এটা পশ্চিমবঙ্গের অংশ হতে পারে? এই যে মানুষগুলো, তাদের কথাবার্তা, আচার আচরণ, ইত্যাদি; আশেপাশের এই যে দৃশ্যাবলী, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, গাছপালা, ফুল সবই যে আমার চেনা আমার জানা বাঙ্গালীত্ব থেকে ভীষন ভীষন আলাদা! অথচ এটা পশ্চিমবঙ্গ। কথায় কথায় বিচ্ছিন্নতাবাদী স্লোগান তোলার পক্ষপাতি আমি নই। আর, আজ অবধি নিজেকে এটা বিশ্বাসও করাতে পারি নি যে আলাদা গোর্খাল্যান্ড হয়ে গেলেই পাহাড়ের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু, নিজের কাছে অন্তত সৎ হতে গেলে আমি বলতে বাধ্য যে ওই কোনো এক অক্টোবরের কোনো এক দিনে জীবনে প্রথমবার পাহাড়ের অভিজ্ঞতা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল এই অঞ্চলগুলোকে পশ্চিমবঙ্গের অংশ ভাবা বা রাজনৈতিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গের অংশ করে রাখা আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না।

আজ যখন বেশ কয়েক বছর ধরে এই পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবী (এখন বিমল গুরুং-দের G.J.M অর্থাৎ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এই আন্দোলন চালাচ্ছে। সেই ২০০৪ সালে সুবাস ঘিসিং-এর সেই G.N.L.F-ই ক্ষমাতাসীন ছিল) এবং তাকে ঘিরে যথেচ্ছ রাজনীতি চলছে, হঠাৎ করে এই সব মনে পড়ে যাওয়া (আর ব্লগের পাতায় ছাইপাশ কি সব লিখে ফেলা) আর তাকে ঘিরে আরো কিছু কথা মনে আসা হয়তো খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আচ্ছা, এই মানুষগুলো কারা? কি পরিচয় এই গোর্খাদের? আমি, আর আমার মতন মানুষেরা কি জানে, কতটা জানে এদের সম্পর্কে?

আগেই উল্লেখ করেছি, আমার বর্তমান ঠিকানা কলকাতা। যে ফ্ল্যাটবাড়িতে আমি থাকি, সেখানে আমার ঠিক নিচের তলায় একটা পরিবার আছে, দরজায় তিনখানা নাম লেখা XXX রাই, YYY রাই, ZZZ গাট্টানি। সিঁড়িতে উঠতে নামতে দেখা হয়ে গেলে যেটুকু সৌজন্যমূলক বাক্যালাপ, এর বাইরে কোনোদিন তাদের সাথে কোনো কথা আমার হয় নি। তবে, তাদের দেখে, তাদের চেহারা, গড়ন দেখে, আর দরজায় তাদের নামের পদবী দেখে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় নি যে এঁরা গোর্খা। গোর্খা যাঁরা সুদূর অতীতে নেপাল অঞ্চল থেকে দক্ষিণে বর্তমানের দার্জিলিং জেলায় বসবাস শুরু করে। এটা ঠিক যে কোনো এক সময়ে তাঁরা নেপালের বাসিন্দা ছিল। কিন্তু, ইতিহাস বলে, সে তো অনেক অনেক কাল আগের কথা। আর, এই গোর্খা নামটার ব্যবহারই তো এই মানুষগুলোকে নেপালের বাসিন্দাদের থেকে আলাদা করে। অথচ এক্ষুনি রাস্তায় গিয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলবে এরা নেপালী। এরা ভারতের বৈধ নাগরিক, এদের বাপ-ঠাকুর্দারাও ভারতের নাগরিক (আর হ্যাঁ, মা-ঠাকুমা-দিদিমাও)। অথচ পথ চলতি যে কেউ এদের দেখলেই নেপালী বলবে। আর এটা এই গোর্খাদের কাছেও এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এক সময় আমাকে নিজে একজন গোর্খার সাথে রীতিমত তর্ক করে বোঝাতে হয়েছিল কেন তাকে নেপালী বলাটা অনুচিত, কেন তাকে গোর্খাই বলাটা ঠিক। আলাদা রাজ্যের দাবী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবী হয়তো ঠিক না, কিন্তু এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোও কি একটু অস্বাভাবিক না?

আমার বিশ্বাস আমার পাঠিকা/পাঠক আমার সাথে অন্তত এই ব্যাপারে একমত হবেন যে এটা অস্বাভাবিক। দেশের কিছু মানুষকে একটা প্রতিবেশি রাষ্ট্রের বাসিন্দাদের নামে চিহ্নিত করা কখনোই স্বাভাবিক হতে পারে না। আসলে আমরা সেটাকেই স্বাভাবিক বলে জেনে-বুঝে আসি যেটা সমাজে প্রতিদিন ঘটছে। তাই ফসলের মাঠে ধানের গোড়ায় রক্তের দাগ আজ স্বাভাবিক। এক বাজার মানুষের মধ্যে একজন বৃদ্ধ মানুষের বিনা চিকিৎসায় পড়ে থেকে থেকে মরে যাওয়াটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক। হঠাৎ হঠাৎ রাতবিরেতে পাশের বাড়ি থেকে কোনো নারীর আর্ত চিৎকার ভেসে আসাটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক। এ তো সমাজে আকছার ঘটছে। তাই স্বাভাবিক। ঠিক তেমন ভাবেই এই ভীষণ অস্বাভাভিক, অন্যায় একটা ব্যাপার, আমাদেরই দেশের, আমারই রাজ্যের কিছু মানুষকে হঠাৎ করে নেপালী নামে চিহ্নিত করাটাও কেমন যেন স্বাভাবিক করে নেওয়া হয়েছে। আর, এই ধরনের যাবতীয় স্বাভাবিকিকরণের মাধ্যমে এই মানুষগুলোকে প্রান্তিকায়িত করতে করতে যখন তারা একসময় আর এই স্বাভাবিককে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, গর্জে ওঠে, শহর কলকাতায় বাবু-বিবিরা তখন কোন এক অদ্ভূত দেশপ্রেম, অদ্ভূত জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দেন। আর তা নিয়ে শুরু হয় আরেক দফা ক্লেদাক্ত খেলা অধুনা যার নাম দেওয়া হয়েছে রাজনীতি।

Monday, April 18, 2011

অভিমন্যু সমীপেষু


আমি তো পাথর হতে আসি নি, তবে কেন
তবে কেন এমন

নখ আর দাঁত আর পবিত্র লিঙ্গের আস্ফালন!

আমি তো শুধু মাত্র পাশের সহযাত্রিকে

তার নাম জিগ্যেস্‌ করেছি, আর

জানতে চেয়েছি

এখন কটা বাজে

Saturday, April 9, 2011

একজনকে লেখা একটা চিঠির অংশবিশেষ (বা তাঁর ব্লগ সকলের উদ্দেশ্যে একটি কমেন্ট)

বিএসএফ ক্রোনিকল্‌ নামের বাংলাদেশের এক ব্লগ ঘুরে এসে সেখানে এই মন্তব্য করি আমিঃ

...আপনার এই ব্লগের শেষ পাঁচ-ছয়খানা লেখা পড়লামবলা যায়, চোখ বুলালাম ভাই! আপনার ব্লগ দেখে বড্ড দুঃখ হলো মনে; হ্যাঁ, দুঃখ হলো। হলো এই ভেবে যে এই পাড়ে আমি, আদ্যোপান্ত এক বাঙালী, ভারতীয় পশ্চিমবঙ্গীয় এক বাঙালী, যে রোজই এটা বিশ্বাস করতে ভালবাসে যে এই সীমান্তটি মানব বিরোধ, যে বিশ্বাস করে যে অহেতুক দুই বাংলার মধ্যে রাজনীতির নামে কাঁটাতার তোলা হয়েছে, নিজের বাপ-ঠাকুর্দার আদি বাসা বরিশালে যেতে হলে এখন পাসপোর্ট করতে হবে ভাবলে যার বুকের ভিতর একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে, সে আপনার এই ব্লগের লেখা আর বিষয়গুলো দেখে কষ্ট পেলো

আপনার সবগুলো ব্লগই এপারের অর্থাৎ ভারতীয় সীমা সুরক্ষা বল বা বিএসএফ-এর ওপার, অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের উপর করা কোনো না কোনো খারাপ কাজের খবর জানায়। কেবল একটা ব্লগ আছে দেখলাম, যেখানে এই বিএসএফ-এর উল্লেখ নেই, সেটা বাংলাদেশ সরকারের মানবিকতার একটা দৃষ্টান্তর উল্লেখ করে। আমার আপত্তিটা এখানে না যে আপনি ভারতীয় সেনানীর কুকীর্তি এভাবে তুলে ধরেছেন। বেশ করেছেন এই সব কথা লিখে, পাঁচজনকে জানিয়ে। মানুষের এগুলো জানা দরকার। কিন্তু, আপনার ব্লগে চোখ বোলালে যে কেউই এটা বলে দিতে পারবে যে ব্লগটা, আর তার সাথে সাথে লেখকের মানসিকতা, খুব বেশী ভাবে পক্ষপাত দুষ্ট। আমার সমস্যাটা সেখানেই।

কেন এই ভাবে বেছে বেছে কেবল ভারতের সেনাদের আপনার তীরের লক্ষ্য বানাচ্ছেন? B.D.R বা R.A.B একেক সময়ে কি করে? তাকে সমর্থন করেন আপনি? তাদের সু না কু, কোনো কীর্তিরই কোনো উল্লেখ নেই কেন আপনার ব্লগে? যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘটানো অমানবিক কাজগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরাই আপনার উদ্দেশ্য হয়, তবে তারা বাদ কেন? আর, আপনার জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করি, বি.এস.এফ অনেক সময়েই মানবতার অনেক সুন্দর সুন্দর নিদর্শন রাখেনকই, সেগুলোর জায়গা হয় না কেন আপনার এই ব্লগে? দেশপ্রেম ভালোকিন্তু অন্ধতা সবসময়েই ক্ষতিকারকআপনি রক্তের সম্পর্কে আমার কেউ হন নাকিন্তু আমাদের প্রাণের ভাষা একই - বাংলাআমরা একই সংস্কৃতির মানুষতাই, আপনাকে এই কথাগুলো বললামভুল বুঝবেন নাভালো-মন্দ সব খানেই আছেন যে কোনো ধরণের একচোখামি থেকে বেড়িয়ে আসুনঅনেক ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেনঅন্যেকেও ভালো রাখবেন


আমার প্রনাম ও ভালবাসা গ্রহন করবে। ...

Friday, April 8, 2011

সিন্ড্রোম-ক্রিয়েন্ড্রোম

(এই লেখাটা এখনো সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে নি। তবু এখানে এই অর্ধেক অবস্থাতেই তুল দিলাম কেন জানি না। যখন যখন যেভাবে যেভাবে এটা সম্পূর্ণতার দিকে পা বাড়াতে থাকবে, তখন তখন সেই ভাবে পরিবর্তন করব। আবার বলছি, অনেকটা স্বীকারোক্তির ঢঙ্গেই না হয়, লেখাটা এই অবস্থায় থাকতেই কেন এখানে তুলে দিলাম, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই)

এইড্‌স নামটা ঘরে ঘরে চাউড় হলো ঠিক কোন সময়ে মনে নেই। সেলফোন যেমন, এখনো স্পষ্ট মনে আছে, আমার গ্র্যাজুয়েশন চলাকালীনও এতটা সর্বব্যাপী হয় নি। বলা ভালো, বি.. থার্ড ইয়ার যখন আমরা, আমার হাতেও একটা সেলফোন চলে আসলো, ওই সময় থেকেই ধীরে ধীরে মোবাইলের সর্বত্রগামিতা এমন প্রসারিত হলো। তেমনি এইড্‌স এই নামটার সাথে আপামোর জনসাধারনের পরিচিতি সম্ভবত ঘটে ওই আমরা যখন ক্লাস এইট-নাইন। মনে আছে, বায়োলজি ক্লাসে এইড্‌স নিয়ে মৌলিক কিছু জিনিস বোঝানোর সময় রোগ আর সিন্ড্রোমের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও আলোচনা করা হয়েছিল। পরীক্ষাতেও নির্ঘাত কোনো না কোনো ভাবে তা নিয়ে প্রশ্নও এসে থাকবে। disease আর syndrome

এই এত গৌরচন্দ্রিকার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তবু, ওই আমার যা স্বভাব, অপ্রয়োজনীয় একটা বাহুল্য করে বিরক্তির উদ্রেক ঘটালাম। যেটা বলবার, আত্মবিধ্বংসী একটা ভাব মনে আসা আর তার ফলে দুএকটা অদ্ভূত, উদ্ভত কাজকম্মো ঘটিয়ে ফেলাটাও বোধহয় অমনই; একটা সিন্ড্রোম। আমার ক্ষেত্রে তো বটেই। আত্মবিধ্বংসী শব্দটা লিখলেই অনুভব করা যায় কত জোর এর মধ্যে। ভীষণ শক্তিশালী শব্দ। জানি না যথার্থ প্রয়োগ হলো কি না। তবে হ্যাঁ, এর ফলে, এই সিন্ড্রোম আমার মধ্যে থাকার ফলে একেক সমইয় যে সব অবস্থার সমুখীন আমাকে হতে হয়, হতে হয়েছে, সেগুলোও নিতান্ত দুগ্ধপোষ্যজাত থাকেনি, থাকে না। একেক সময়ে এমন হয় যে বুঝতে পারছি কোনো একটা কথা বলে ফেলা আমার নিজের জন্যই খারাপ হবে, তার ফলে সমস্যায় পড়তে হবে এমন কি, সমস্যাটার ধারা-ধরণ কেমন হবে সেটাও হয়ত আন্দাজ করতে পারছি তবু সেই কথাটা বলে ফেলি। তেমন কাজটা করে বসি। আর, সেটা যে নিতান্ত অনিচ্ছায় করি, একেবারেই তা না। বরং, একটা প্রবল ইচ্ছা পেয়ে বসে। মনে হয়, এটা বেশ নিজের সাথেই একটা পরীক্ষা হবে। করেই দেখা যাক্‌ না, ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়! যেন একটা মজা, একটা খেলা। নিজের থেকে নিজেকে একটা দূরত্বে বসিয়ে, দূর থেকে নিজের উপর এই পরীক্ষার রকমসকম দেখতে চাওয়া। আখেরে হয়তো এটা একটা খেলাই। কিন্তু তার ফলে যে খেসারত দিতে হয়, নিজের উপর দিয়েই যা যা যায়, মোটেই খুব সুখকর হয় না তা। গত দশ-বারো বছরের কথা মাথায় রেখে বলে দেওয়া যায়, এর ফলে আমার জীবনের গতি প্রকৃতিই অনেক ভাবে অনেক সময়ে বদলে গেছে।

বালুরঘাটে যতদিন ছিলাম, অর্থাৎ জন্ম থেকে স্কুল শেষ হওয়া অবধি, জীবনটা বেশ নিস্তরঙ্গ ছিল। সে সময়ে ক্রিকেট ছিল, স্কুল ছিল, মুষ্টিমেয় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মাঝে মাঝে সাইকেলে করে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া ছিল। পূজার সময়ে, অবশ্যই কিছুটা বড় হবার পর, নির্জন অন্ধকার গলি খুঁজে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেটে টান মারা ছিল... এমনই টুকরোটাকরা কিছু জিনিস আর কি! মোটের উপর বেশ সরল একটা জীবন ছিল। কলকাতায় যাবার পর জীবন যে সাংঘাতিক জটিল হয়ে যায়, তা না। তবে আজকে, একটা দূরত্বে বসে দেখলে এটা অনুভব করে থাকি, কলকাতার অধ্যায়ের তুলনায় সত্যিই বালুরঘাটের জীবন অনেক সরল ছিল, আর নিস্তরঙ্গ ছিল। কেন, কখন, কীভাবে জানি না, এই আত্মবিধ্বংসী ভাবটা আমায় পেয়ে বসল। এও কি শহর কলকাতার আমাকে তার মস্ত হা-এর মধ্যে গিলে নেবারই এক পরকাশ মাত্তর? কে জানে!

আজ আমি একটা ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করছি। পিএইচডি। ফলত চাই না চাই, বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ, কনফারেন্স প্রভৃতি অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা পড়ে। সে সব জায়গায় যেমন, তেমনি বন্ধুদের সাথে মেতে ওঠা নিছক আড্ডাতেও গ্রাম-শহর নিয়ে কথা ওঠে অনেক সময়েই। গ্রাম মানেই এরকম এরকম, আর শহর মানেই এই এই চরিত্র হবেই। এমন সরলীকরণও অনেক ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। আর সেটা ঘটলে প্রথম যে মানুষটা বিরোধিতা করে, সে আমি। এমন ভাবে মোটের উপর গ্রাম আর শহরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট চিহ্নিত করে দেবার আমি সবসময়ই বিরোধী। কেননা, আমার যাপিত জীবনে গ্রাম না হলেও প্রায় গ্রামীন সমাজের অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনি কলকাতার মতন অত্যাধুনিক নাগরিক জীবনও আছে। তবু, একা একা ভাবতে বসলে মাঝে মাঝে মনে হয়, সত্যিই কি শহর বলেই এমন কিছু কিছু আমার সাথে আজ ঘটছে যেটা আমি সারাটা জীবন বালুরঘাটে কাটিয়ে দিলে কখনোই ঘটত না? এমন কিছু ভাবনা, কিছু দৃষ্টিকোণ, কিছু পদক্ষেপ, যা এই মস্ত কলকাতা শহরের ফলেই আমার যাপিত জীবনের সাথে যুক্ত হয়েছে! কোনো কোনো মানুষের সাথে বিশেষ কোনো সম্পর্কে যুক্ত হওয়া (কৌতুহল ভালো, দুটো লাইনের মাঝখানটা পড়ে ফেলার ক্ষমতাকেও আমি কদর করি। কিন্তু এইখানে সম্পর্ক বলতেই ওই একই রকম ভেবে নিলে আখেরে আপনাকে/তোমাকেই ঠকতে হবে। কেননা, ভুল ভাবছেন/ভাবছ।), একটা কোনো কথা বলে ফেলা, অনেক কিছুই জীবনে প্রথমবার করে ফেলা, ইত্যাদি তো বারবার হয়ে আসছে আমার সাথে। নিজেকে তাই প্রশ্নটার সম্মুখীন হতে দেখি মাঝে মাঝে। কিন্তু, এখনো তার কোনো সদুত্তর পাই নি। হয়তো কোনোদিনই পাব না। আর কখনোই হয়ত বুঝে উঠতে পারব না, আমার এই সিন্ড্রোমের, এই হঠাৎ হঠাৎ কেমন একটা আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠার সাথে আমার বর্ত্তমানের যাপিত নাগরিক জীবনের প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ আছে কি না।

Tuesday, April 5, 2011

রবীন্দ্রনাথ, দেশ, ভারতবর্ষ

ইচ্ছে হলো শেয়ার করি :

বর্ত্তমান ভারতবর্ষে যাদের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা আছে এ রাখি তাদের কাছ থেকেও নিরস্ত হবে না। তারা যদি প্রত্যাখ্যান করে আমরা প্রত্যাখ্যান করব না আমরা বারম্বার সহস্রবার প্রীতির বন্ধনে ঐক্যের বন্ধনে বাঁধবার চেষ্টা করব এইটেই আমাদের একটা দায় বিধাতা এইটেই আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। পূর্ব্ব পশ্চিম রাজা-প্রজা সকলকেই ভারতবর্ষ সকল প্রকার বিরুদ্ধতার ভিতরেও একক্ষেত্রে আকর্ষণ করবার জন্য চিরদিন চেষ্টা করবে এই তার ধর্ম্ম, এই তার কাজ অন্য দেশের পোলিটিকাল ইতিহাস থেকে এ সম্বন্ধে আমি কোন শিক্ষা নিতে প্রস্তুত নই আমাদের ইতিহাস স্বতন্ত্র। আমাদের দেশে মনুষ্যত্বের একটা অতি উদার অতি বিরাট ইতিহাস সৃষ্টির আয়োজন চল্‌চে এই আমার নিশ্চয় বিশ্বাস তার মধ্যে বাঙ্গালীও যেমন আছে ইংরেজও তেমনি আছে আজ আমি রাখি দিয়ে একজনকে বাঁধব এবং আরেকজনকে বাঁধব না বলেই ভারতবর্ষের অধিদেবতা তাতেই তাঁর সম্মতি দেবেন তা নয়। যেমন ইংরেজ পূর্ব্ব ও পশ্চিমবঙ্গকে সত্যই স্বতন্ত্র করে দেবার মালিক নয় তেমনি আমরাও রাখিবন্ধনের গন্ডির দ্বারা ভারতবর্ষে কেবল আমাদের মনের মত জাতিকেই গড়ব এবং অন্যকে বর্জন করব তা চল্‌বে না। যারা আমাদের আঘাত করতেও এসেছে তাদেরও আমরা আত্মসাৎ করব আমাদের উপর এই আদেশ আছে। এখনকার দিনে একথা বল্লে কারো কাছে উপাদেয় বলে মনে হবে না অনেকে মনে করবেন এ একটা কাপুরুষতার লক্ষণ কিন্তু তবু এই সত্য কথাটি বলা চাই। সত্যকে কোন কারণেই কোন জায়গাতেই সীমাবদ্ধ করা চলবে না। ভারতবর্ষে ইংরাজও সত্য আজ তারা যদি আমাদের অসুখকর হয়েই থাকে তবু ভারতবর্ষের হিসাবে তারা সত্য তাদের সুখকর কল্যাণকর করে তুলতে হবে যতই বাঁধা পাই ততই চেষ্টাকে জাগ্রত রাখতে হবে। কারণ এই আমাদের স্বধর্ম্ম। স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ। তোমাদের আশ্রমে তোমাদের রাখিবন্ধনের দিনটাকে খুব একটা বড়দিন করে তুলো। বড়দিন মানেই প্রেমের দিন মিলনের দিন সে প্রেমে সে মিলনে ভারতের সকলেই আহূত ভারতবর্ষের যজ্ঞ ক্ষেত্রে আজ বিধাতা যাদের নিমন্ত্রণ করে এনেছেন আমরা তাদের কাউকেই শত্রু বলে দূরে ফেল্‌তে পারব না। ইংরেজকে ভারতের করে তুলতে হবে। তারা নিজেরা হতে না যদি চায় আমরা করতে চাইব। আমাদেরই কাজ এই। নিয়তই আমরা এই চেষ্টায় থাকব। অতএব সর্ব্বাগ্রে মনকে প্রসন্ন উদার করতে হবে ভারতবর্ষের ইতিহাসের অন্তরতম অভিপ্রায়কে সুষ্পষ্ট করে অনুভব করতে হবে। এ পর্য্যন্ত যে সব ক্ষুদ্র পথ আশ্রয় করেছিলুম সে আমাদের পথ নয় আমাদের রাজপথ অতি প্রশস্ত ও পুরাতন কোনো সাময়িক ব্যাপারের কাঁটার বেড়া তাকে সঙ্কীর্ণ ও অবরুদ্ধ করবে না। আমরা কষ্ট পেয়ে দুঃখ পেয়ে আঘাত পেয়ে সর্বস্ব হারিয়েও সকলকে বাঁধব সকলকে নিয়ে এক হব এবং একের মধ্যেই সকলকেই উপলব্ধি করব। বঙ্গবিভাগের বিরোধক্ষেত্রে এই যে রাখিবন্ধনের দিনের অভ্যুদয় হয়েছে এর অখন্ড আলোক এখন এই ক্ষেত্রকে অতিক্রম করে সমস্ত ভারতের মিলনের সুপ্রভাতরূপে পরিণত হোক্‌। তাহলেই এই দিনটি ভারতের বড়দিন হবে। তাহলেই এই বড়দিনে বুদ্ধ খ্রিষ্ট মহম্মদের মিলন হবে। একথা কেউ বিশ্বাস করবে না কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। আমাদের আশ্রমেও যদি ভূমা স্থান না পান সেখানেও যদি সাময়িক বারোয়ারির ক্ষণকাল স্থায়ী মৃন্ময় দেবতার পূজার মত্ততাই সঞ্চারিত হয় তাহলে আশ্রমধর্ম্ম পীড়িত হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেশ সাহিত্যসংখ্যা ১৩৮৮, পৃ ১২

সত্য সেলুকাস !

বন্ধুদের ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ, বিক্ষিপ্ত সন্দেহ, ইতস্তত মনঃক্ষুণ্ণতা, ইত্যাদি এবারের বইমেলার দশদিনের মধ্যে অন্তত সাতদিন মেলায় যাওয়া থেকে আমাকে নিরস্ত করতে পারেনি। আমার কাছে কলকাতা শহরের সবচেয়ে বড় উৎসব এই বইমেলা। এত বড় মেলা, এত তার সমারোহ, খুবই স্বাভাবিক যে সাতটি দিন সেখানে ঘোরাঘুরি করলে নানান অভিজ্ঞতা হবে। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। তবে, এখানে সে সব অভিজ্ঞতার ডালা খুলে বসা আমার উদ্দেশ্য না। বইমেলার উল্লেখ করলাম তার কারণ এবার বইমেলার পশ্চিমবঙ্গ মণ্ডপে বসুমতী প্রকাশন থেকে সংগ্রহ করা নানা বইয়ের একটা ছিল মানিকের একটা ছোটগল্পের বই। গোটা দশেক গল্প, নাম মোটা ও মিহি কাহিনী। টিকটিকি, হাত, বিপত্নীক, প্রভৃতি গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল এই বইয়ে। বসুমতী প্রকাশন থেকেই প্রকাশিত হয় বইটা। আমি এর আগে যে মানিকের লেখা ছোটগল্প পড়িনি, তা নয়। এখনো মনে আছে বহু বছর আগে (তখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোইনি) নেকী পড়ার অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাই একটা। তবে আমার ক্ষেত্রে ছোটগল্পকার মানিকের আবিষ্কার ঘটলো এই মোটা ও মিহি কাহিনী মারফৎ। ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পদ্মানদীর বা পুতুলনাচের মানিক আমার ভিতরে অনেক দিন আগেই তার পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছিল। আর, মোটা ও মিহি কাহিনী পড়ার পর ছোটগল্পকার মানিক তার নিজের মত মরমে পশিল। বিশেষ করে ওই বিপত্নীক গল্পটা! শহরের চাকুরিরত মধ্যবিত্ত মধ্যবয়স্ক বাঙ্গালি পুরুষ... না! এভাবে না। গল্পটা পড়া উচিত (উচিত শব্দটা সচেতন ভাবেই ব্যবহার করলাম এখানে)। ওই যে, পড়তে হয়, নইলে কি যেন করতে হয়! আর, শুধু বিপত্নীক কেন! প্রতিটা গল্পই যে অনন্য। বিষয়, বাচন ভঙ্গি, শব্দ চয়ন, প্রতিটি ব্যাপারই চমকে দেয় আর, না চাইলেও, ভাবায়; কখনো বা অস্বস্তিতেও ফেলে। জানি, মানিকের স্তুতি গাইবার কোনো মানেই হয় না। তাতে মানিকের মহত্ব হ্রস্ব বা দীর্ঘ কোনোটাই হবার নয়। মানিক যা, তাই। তবু, মানিকের এই বইটা হাতে পেয়ে পড়ে ফেলে অস্বস্তি, বিষ্ময়, ভাবনা এই সব ছাইপাশ লিখতে বাধ্য করলো আমায়।

আরেকটা কথা। এবার বইমেলায় এক কাপ কফি বিক্রি হচ্ছিল বারো টাকা করে। খেয়েছি কয়েকদিন। কাপ প্রতি বারো টাকা। আর, মানিকের এই গোটা দশ-বারো গল্পের সংকলন মোটা ও মিহি কাহিনী, তার দামও বারো টাকা।

Saturday, April 2, 2011

অনর্থক

স্যামুয়েল বেকেটের লেখা সেই দিগন্তসৃষ্টিকারী নাটক ওয়েটিং ফর গোডো (জানিনা চ্চারণ ভুল হলো কি না; ইংরেজিতে তো Waiting for Godot) প্রথম পড়ি সম্ভবত এম.এ পড়াকালীন। এই সব লেখা পড়তে গেলে মাথায় মস্ত এক চাপ কাজ করতে থাকে, জ্ঞানত বা নিজের অজান্তেই। পৃথিবীতে সাড়া জাগানো একটা সাহিত্য সৃষ্টি; সেটা আমার হাতে, আমি পড়ছি সেই লেখা... সে কি একটুখানি ব্যাপার না কি! বেকেটের এই লেখাটা পড়তে গিয়েও সেই ব্যাপারটা ঘটে আমার সাথে। কিন্তু, অস্বীকার করতে পারব না, নাটকখানা আমার একেবারেই ভালো লাগে নি। হ্যাঁ, মনে হয়েছিল, এই লেখার মানে কি, কি প্রয়োজন এইরকম একটা কিছু লেখার! লেখাটা তো কোনোকিছুই বলল না, পাঠক হিসেবে কিছুই পৌছুল না আমার কাছে। দুটো মানুষ রোজ দেখা করছে, নানা অসংলগ্ন বিষয়ে অসংলগ্ন আলাপচারিতা করছে, আর গোডো নামের কোনো লোকের জন্য অপেক্ষা করছে। কে এই গোডো, এই দুজনের সাথে তার কি সম্পর্ক, আর কেনই বা নিজেদের আর সব কাজকম্মো ফেলে তারা এই দুজনের জন্য অপেক্ষা করছে, কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। গোটা নাটক জুড়ে, দুদিন ব্যাপী, দুঅঙ্ক ব্যাপী, এই দীর্ঘ অপেক্ষা। মাঝে দুতিন জন মানুষের অবতারণা ঘটছে। কিন্তু তাদের আসা এবং যাওয়া, তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, কোনো কিছুরই কোনো সুষ্পষ্ট কারণ নেই। নাট্যকারেরও কোনো মাথাব্যাথা নেই সেগুলো পরিষ্কার করে দেবার। কি অদ্ভূত, কি অনর্থক।

কিন্তু, পরবর্ত্তীকালে আবার যখন এই লেখাটার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, আমার এম.এ সিলেবাসে বা সিলেবাসের বাইরের কোনো প্রসঙ্গে, আবার করে যখন ভাবতে বসেছি লেখাটা নিয়ে, ভাবতে হয়েছে, একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছি। যেটা হয়ত বা ইউজিন আয়োনেষ্কোর রাইনোসেরাস বা গণ্ডার পড়তে গিয়েও হয়েছে। এটা ঠিক যে এই লেখাগুলো কিছু বলে না। কিছু বলে না বলতে কোনো নির্দিষ্ট গল্প গোছের কিছু পরিবেশন করে না এই লেখাগুলো। একটা নির্দিষ্ট শুরু, নির্দিষ্ট শেষ থাকে না এই নাটকগুলোর। কিন্তু, এলোমেলো ভাবে, শৃঙ্খলতাহীণতার মধ্য দিয়ে এই ধরনের নাটকগুলো অনেক কিছু বলে যায় আমাদের। আসলে, কিছু বলে না, আমাদের শ্রোতা, পাঠক, দর্শকদের অনেক কিছু বলায়। নিজের সাথে নিজে কোন সংলাপে মেতে উঠতে বাধ্য হই। যে সময়ে বাস করছি, যে সমাজে যাপন করছি, চলছি-ফিরছি, হাঁটছি-বসছি, রাস্তা-ঘাটে, অফিসে বা বিছানায় যে মানুষগুলোর সাথে দেখা হচ্ছে, যে আলোচনা করছি, যে কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইছি, যে কথাটা নিয়ে চায়ের দোকানে মেতে উঠতে চাইছি, সেগুলোর মানে কি, কি প্রয়োজন সেসবের? প্রতিদিন যা করছি, আখেরে সেগুলোর অর্থ কি? দিনের শেষে কি বলে সেগুলো? আদৌ কি কিছু বলে? তখন মনে হতে থাকে, একটা ওয়েটিং ফর গোডো বা গণ্ডার তো আসলে আমাদের প্রাত্যহিককেই তুলে ধরছে, আমার সময়, আমার যাপন, তার যে অন্তঃসারশূণ্যতা, সেই শুন্যই তো এখানে ফুতে উঠছে। জানি না এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে কি না, কিন্তু মার্কিন তথ্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল মুরের (যাঁর ৯/১১ জর্জ বুশ জুনিয়রের মার্কিন সরকারকে বেজায় অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল) একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। এই ৯/১১ তথ্যচিত্রটি অস্কার জিতলে মুর পুরষ্কার নিতে মঞ্চে উঠে অনেকটা এরকম কিছু বলেছিলেন I deal in non-fiction at a time when the fictitious head of a fictitious nation attack some fictitious state under some fictitious pretext…

(দাবী করছি না যে আমি এখানে মুরকে কোট করলাম, কিন্তু তাঁর বক্তব্য এই ছিল।)

'আমিষ': ভালবাসার বিনির্মাণ

"আমিষ" ভালবাসার বিনির্মাণ   শুভ্রদীপ দাশগুপ্ত       আমিষ (২০১৯, অসমিয়া) রচনা ও নির্দেশনাঃ ভাস্কর হাজারিকা     অবশেষে ছবিটি দেখ...