
উপরের এই ছবিটা খুব একটা পরিচিত নয় বলেই আমার ধারণা। অন্তত আমার ব্লগ যাঁরা পড়ছেন বা পড়ে থাকেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই সম্ভবত এই ছবিটা, ছবির মানুষ দু’জন, সম্পূর্ণই অপরিচিত। আসলে এটা একটা ফিল্মের থেকে নেওয়া স্টিল। একটা ফিল্মের দৃশ্য। ইউরোপীয়, স্প্যানিশ ফিল্ম – Diario de una Nimfómana। আমার মত স্প্যানিশ-অজ্ঞ মানুষের জন্য, ইংরেজিতে, Diary of a Nymphomaniac। বলা বাহুল্য, এই ফিল্মটা আমি ইংরেজি সাবটাইটেলে দেখি। নাম শুনে মনে হতেই পারে পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম - নিম্ফোম্যানিয়াক১। সে ক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, তাত্ত্বিকেরা ‘পর্ণোগ্রাফি’র হয়ত বহুল বিস্তৃত সংজ্ঞা-ব্যাঞ্জনা তৈরী করে রেখেছেন, কিন্তু সাধারণত, সাধারণ মানুষ পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম বলতে যা বুঝে থাকে, এই ডায়েরি অফ্ আ নিম্ফোম্যানিয়াক২ কিন্তু তা নয়। বরং নারীবাদের ইতিহাসে পর্ণোগ্রাফি বিরোধী আন্দোলন ঘটে যাবার পরে নব্য তত্ত্বায়নে এই ডায়েরি-কে বরং 'ইরোটিকা'র পর্যায়ে ফেলা যেতে পারে (যদিও আমি এই নামকরণ, বর্গীকরণ নিয়ে তেমন ভাবিত নই)। ফিল্মটায় এমন অনেক দৃশ্য-মুহূর্ত আছে যা হয়ত কারো লিবিডো চরিতার্থ করবে, কিন্তু এই ডায়েরি অফ্ আ নিম্ফোম্যানিয়াক আরো কিছু, আরো অনেক কিছু, অন্য অনেক কিছু। ফিল্মটার বিষয়বস্তু কি তা নিয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে রাজি নই৩। ছবিটা দিয়ে লেখা শুরু করেছি, কেবল সেটাকে ঘিরে দু’চার কথা বলাই আমার উদ্দেশ্য।
ছবিটায় একজন ঠাকুমা আর তার নাতনি। এই নাতনিই ফিল্মটার মুখ্য চরিত্র; তাকে ঘিরেই সমস্ত কিছু আবর্তিত হয়। ফিল্মে এই দৃশ্যের কিছু পরেই ঠাকুমা মারা যান। আর, মেয়েটি অনুভব করে – “একমাত্র মানুষ যে আমায় বুঝত” তাকে সে হারিয়ে ফেলল। হ্যাঁ। পৃথিবী মেয়েটিকে বুঝতে ব্যার্থ হয়। তাঁর অফিস, বন্ধুবর্গ, প্রেমিকেরা (অথবা সেই সব পুরুষ যারা তাঁর জীবনে আসে, সম্পর্ক তৈরী হয়, সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়...) – সবাই ব্যার্থ। কেউই তাকে জেনে উঠতে পারে না, বুঝতে পারে না। আর, ফিল্মটা যেখানে শেষ হচ্ছে – একটা লং শট, মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে, আস্তে আস্তে ডিসল্ভ হয়ে যাচ্ছে এন্ড-রোলে – আমরা বুঝতে পারি, আরো একবার, এই পৃথিবী মেয়েটি কে বুঝতে ব্যর্থ হতে বাধ্য। আর তার কারণ হলো সে একজন নারী। সে একজন নারীর মতো করে ভালবাসে, সে একজন নারীর মতো করে চায়। তাঁর যাপন, তাঁর ভাবনার ধারা সবই একজন নারীর মতো করে। সমস্ত ফিল্ম জুড়ে যেন এই শেষের মুহূর্তটার জমিই তৈরী করা হয়। আর এভাবেই, নিজের মতো করে ফিল্মটি নিজেকে ওই feminism of sameness থেকে উত্তীর্ণ করে, লিঙ্গহীণ, ইতিহাসহীণ, চিরন্তন, অখন্ড মানবতা-র গড়ে তোলা ধারণা থেকে সরিয়ে নিয়ে, নির্দেশ করে এক পৃথগতার দিকে।
আরেকবার ছবিটায় ফিরে যাওয়া : মেয়েটি জীবনে শেষবারের মতো তাঁর ঠাকুমার হাত নিজের হাতে নিয়ে বসে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই বৃদ্ধা মারা যাবেন, আকস্মিক ভাবে। এই সেই ঠাকুমা, যে এক সময়ে মেয়েটিকে বলেছিল যে এই পৃথিবী অফিস-কাছারি-ব্যাবসা প্রভৃতি না করা কোনো নারীর জন্য দুটো ভূমিকা নির্দিষ্ট করে রেখেছে – বিয়ে আর বেশ্যাবৃত্তি। তাঁর সাথে সাথে তিনি এটাও উল্লেখ করেন “অবশ্য এই দুয়ের মধ্যে খুব একটা ফারাক্ নেই”। নাতনির করা এক প্রশ্নের উত্তরে যখন তিনি জানান যে তাঁর জীবনে মেয়েটির ঠাকুর্দা ছাড়া আর কোনো পুরুষ কোনোদিনও আসে নি, সাথে এটা জানাতে ভোলেন না যে তিনি নিজেও ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল৪। আর ধীরে ধীরে, বিয়ের পর, ওই পুরুষটিকে তিনি ভালবাসতে শিখে নিয়েছিলেন। আর তাই বার বার নিজের নাতনির প্রতি তাঁর যেন নির্দেশ – নিজের মতো করে জীবনটা বাঁচো। নিজের মতো করে। বার বার, বিভিন্ন ভাবে বলা এই কথাগুলো গেঁথে যায় মেয়েটির মনে। সে পারে না এই নিজের মতো করে বাঁচো–কে উপেক্ষা করতে। এভাবেই হয়তো তিনি এই নাতনির কাছ থেকে তাঁর একটা সুস্থ, স্বাভাবিক, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের সুযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন। হ্যাঁ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই পৃথিবীতে এমন একজন মেয়ে নেই, যে একই সাথে নিজের মতো করে, একজন নারী হিসেবে তাঁর পৃথিবীটাকে দেখার উপর ভিত্তি করে, যাপন করে ওই আমরা যাকে সুস্থ-স্বাভাবিক-সুখী জীবন বলে থাকি, সেটা পেয়েছে। এটা সম্ভব না। উল্লেখ্য, এখানে নারী বলতে আমি ওই চলতি ধারণার (কেন্দ্রে অবস্থান করা পুরুষের) অপর অংশ বুঝছি না। নারী বলতে নারীই বুঝছি। নারী, যাকে ভেঙ্গে নিয়ে, সরলিকরণ ঘটিয়ে পুরুষের সাপেক্ষে দেখতে চাওয়া আদতে নারী থেকে অন্য কিছু একটা করে নিয়ে সেই অন্য কিছুকে দেখা; নারীকে নয়।
...
এখানেও স্বভাব-বিরোধী, স্ববিরোধী, না হয়ে হুট করে থেমে যাচ্ছি। পাঠিকা/পাঠকের অনেক অভিযোগ থাকতেই পারে। লেখাটা, আবারও, বড্ড ছড়ানো-ছিটানো হল। জানি। তবু, অপারগ এই আমি...
১। আমরা জানি এই নিম্ফোম্যানিয়াক শব্দটা প্রাত্যহিক জীবনে ঠিক কী অর্থে ব্যবহার হয়। এটা একটা ঋণাত্বক শব্দ। আজকের চলতি বাংলায় যেমন বেশ্যা, খানকি, রেন্ডি শব্দগুলো গালি হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে, তেমনি ইংরাজিতে এই নিম্ফোম্যানিয়াক শব্দের ব্যবহার। ফিল্মটির একদম শুরুর দৃশ্যেই ঠাকুমা আর নাতনির এক কথোপকথন আছে। সেখানে মেয়েটি এক জায়গায় বলছে – ‘একজন পুরুষের অদম্য যৌন চাহিদা থাকলে তাকে বাহ্বা দেওয়া হয়, macho বলা হয়। সেটা তার দুর্দান্ত পৌরুষের পরিচায়ক হয়ে ওঠে। আর ঠিক একই জিনিস কোনো মেয়ের মধ্যে থাকলে সমাজ তাকে সাথে সাথে বেশ্যা, slut, বলে গালিগালাজ করবে। এই সমাজই আবার সাম্যের কথা বলে বেড়ায়’। ঠাকুমার উত্তর ছোট – সমাজ কথা কম বলে বেশী বেশী ভালবাসলে, আদর করলে, ভালো হত।
২। ফিল্মটির আসল নাম ডায়েরি অফ্ আ নিম্ফোম্যানিয়াক নয়। স্প্যানিশ Diario de una Nimfómana-র অনুবাদ মাত্র। তবু এই অনূদিত নামই আমার এই লেখায় ব্যবহার করছি। আসলে, আগেই বলা হয়েছে, ফিল্মটি আমি ইংরেজি সাবটাইটেলে দেখি। মুখ্যু-সুখ্যু মনিষ্যি তাই ওই ইংরেজি নামের সাথেই বেশী আইডেন্টিফাই করতে পারছি এখানে।
৩। ফিল্মের গপ্পো এভাবে লিখে বা বলে দেওয়ায় এক মস্ত অসুবিধে আছে বলে আমার ধারণা। কথা বলা, লেখা – এগুলো যেমন একেকটা মাধ্যম, সিনেমাও তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা মাধ্যম। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মাধ্যম। ফিল্মের গপ্পো জানতে হলে সেই ফিল্মটি দেখে ফেলাই শ্রেয় বলে আমার ধারণা।
৪। জানি না অপ্রাসঙ্গিক কিনা, কিন্তু এই ক্ষেত্রে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বিভিন্ন বক্তৃতায় করা এক উক্তি খুব মনে পড়ছে। স্পিভাক বারবার জোর দিয়ে এটা বলে থাকেন যে আমাদের এই পৃথিবীতে মেয়েরা বিয়ে করে না, তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। ওনাকে উদ্ধৃত করলে – “women don’t marry, they are given away in marriage”।


