Sunday, July 22, 2012

ইসলাম, প্রাচ্য, প্রতীচ্য ও আরো কিছু



                                                                                          
পুরুষ কন্ঠে কোরানের অংশ পাঠ। তারপর “আল্লা-হু-আকব্বর” ধ্বনির সাথে ঝকঝকে এ.কে. ৪৭ তুলে দেওয়া হল জুমা খানের হাতে। বিঘত খানেক দূরেই খাদের ঠিক ধারে বসে আছে নাজিবা। জুমা খানের কন্ঠে আরো একবার – “আল্লা হু আকব্বর’। তারপর... 
প্রথম দুটো গুলি লক্ষ্যচ্যুত। তৃতীয়টা একেবারে সঠিক নিশানায়। খাদের কিনারায় পিছন ফিরে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা নাজিবা ছিটকে পড়ল। তারপরও একে একে আরো ছয়বার গুলির শব্দ। নাজিবার নির্জীব নিথর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। পরনের নীল বোরখা ছোপ ছোপ লাল মেখে হয়ে উঠল নাজিবার কাফন। পর পর দশটা গুলির শব্দ। আর তাকে ছাপিয়ে নাজিবার নিজের গ্রামেরই শ'দেড়েক দর্শক পুরুষের উল্লাসধ্বনি – “ইসলাম দীর্ঘজীবি হোক্‌”, “মুজাহিদিন দীর্ঘজীবি হোক্‌”...


                                                
অনেক দিন আগে, সম্ভবত নয়ের দশকের মাঝামাঝি, নোয়াম চমস্কিকে এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল - আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ যে ধরণের ইসলাম বিরোধী মনোভাব প্রকাশ করছে, সেই সম্বন্ধে তাঁর অভিমত কি। চমস্কি গোড়াতেই প্রশ্নকর্তার এই ভাবনাকে খারিজ করে দেন যে আদতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইসলামের সাথে কোনও বিরোধ আছে। নিজের এই মতের সমর্থনে তিনি জানান যে ঘোষিত ভাবে ইসলামের নামে সব চেয়ে বেশী রাষ্ট্রীয় কড়াকড়ি, বিধিনিষেধ যেই দেশে আছে, তা হল সৌদি আরব। এবং, যাকে আমরা মধ্য প্রাচ্য বলে জানি, সেখানে সমস্ত দেশের মধ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সবচেয়ে বেশী সখ্যতা সৌদি আরবের। প্রশ্নটা ধর্মের নয়, অর্থনীতির। আর্থিক মুনাফার। স্রেফ বানিজ্যের।
                                     

                                               
মধ্য আফগানিস্থানের পারওয়ান অঞ্চলের কোল-ই-হির গ্রাম। সেখানেই ঘর ছিল মধ্য-কুড়ির নাজিবার। নাজিবাকে কেন এ’ভাবে হত্যা করা হল, এই প্রশ্নের সঠিক জবাব হয়ত নাজিবার সাথে সাথেই অন্য জগতে পাড়ি দিয়েছে। কারো মতে মধ্য কুড়ির এই নাজিবার ‘আসল’ স্বামী এক তালিবানি নেতাকে হত্যা করা দলের সক্রিয় সদস্য, তাই প্রতিহিংসা বশত এই বর্বর হত্যাকান্ড। কারো মতে, তালিবানি নেতা জুমা খানের স্ত্রী নাজিবা অন্য এক তালিবানি নেতার সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বহুগামী ‘নাপাক্‌’ নাজিবাকে উচিত শিক্ষা দেয় তার নিজেরই স্বামী। এ’ছাড়াও আরো একাধিক মত রয়েছে। কিন্তু, মোদ্দা ব্যাপার এই যে - নাজিবা বহুগামী – এই অভিযোগ এনে মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে তা সম্বন্ধে স্থির সিদ্ধান্তে এসে, তালিবানিরা ঠান্ডা মাথায় এই ভাবে তাকে হত্যা করে।

রাজধানী কাবুল থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে, ঘটে যাওয়া ওই নৃশংস ঘটনার ভিডিও ফুটেজ অন্তর্জালের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে, স্বাভাবিক ভাবেই, বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া, নিন্দা। তবে, এটাও পড়ে নিতে অসুবিধা হয় না যে নিন্দা করলেও, প্রেস বিবৃতি দিয়ে রাষ্ট্রনায়কেরা ধিক্কার জানালেও, ওই তারা নিজেরাও এটাকে মেনে নিয়েছেন, মেনে নিয়ে থাকেন। মেনে নিয়ে থাকেন যে এটা কেবল তালিবান নয়, গোটা আফগানিস্থানেরই চিত্র। আফগানিস্থানে এমনটাই হয়। এমনটাই হয়ে আসছে শয়ে শয়ে বছর ধরে কঠোর, কিন্তু সত্য, অপরিবর্তনীয় সত্য। অপরিবর্তনীয়, অর্থাৎ যার কোনও পরিবর্তন সম্ভব না। আফগানিস্থান এমনই।

অথচ একটু চোখ কান খুললে, একবার ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই, ধরা পড়তে বাধ্য – এর চেয়ে বড় অসত্য, ভ্রান্ত ধারনা খুব কমই হতে পারে। গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে গত শতকের চিত্রটা পড়তে চাইলে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে গত শতাব্দী, অর্থাৎ বিশ শতকে আফগানিস্থান অতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। নারী ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছিল। বদল ঘটছিল, যতদিন না বিদেশী অমিতশক্তি আফগানিস্থান নিয়ে কাঁটাছেড়া শুরু করে।

এমির আব্দুর রহমান খান প্রথম আফগানিস্থানকে এক আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর শাসনকালে (১৮৮১ থেকে ১৯০১) প্রচুর নারীবিরোধি আইন খারিজ করা হয়। ভূমি এবং বিবাহবিচ্ছেদের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারীর অধিকার স্বীকৃত হয়। স্বামী মারা গেলে স্বামীর ঠিক পরেই যে আত্মীয় তার সাথে জোর করে বিয়ে দেবার মত জঘন্য প্রথাও নিষিদ্ধ করা হয়। এমিরের স্ত্রী বোবো জান প্রথম আফগান রানি, যিনি বিনা পর্দায় প্রকাশ্য জনতার মাঝখানে আসেন। এমিরের নানান রাজনৈতিক বিষয়েও বোবো সহায়ক ছিলেন। তাঁদের ছেলে আমির হাবিবুল্লাহ্‌ খান পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিভিন্ন নারী অধিকারকে আইনী স্বীকৃতি দেবার পাশাপাশি আফগানিস্থানে প্রথম মহিলা বিদ্যালয়ের প্রবর্তন করেন।

১৯১৯ সালে হাবিবুল্লাহ্‌কে হত্যা করা হলে তাঁর ছেলে আমানুল্লাহ্‌ আরো তীব্রতা এবং দ্রুততার সাথে বিভিন্ন প্রগতিশীল নীতি গ্রহণ করতে থাকেনআমানুল্লাহ্‌ দেশকে প্রথম সংবিধান প্রদান করেন যেখানে স্পষ্টভাবে নারী এবং পুরুষের সমান অধিকারের কথা উল্লেখ করা ছিল। তিনি দেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল ব্যক্তি ও আফগানিস্থানে আধুনিকতার প্রাণপুরুষ মাহমুদ তোরজির কন্যা সোরায়া তোরজিকে বিয়ে করেন। একবার আমানুল্লাহ্‌ এক প্রকাশ্য জনসভায় তাঁর বক্তৃতা এই বলে শেষ করেন যে ইসলাম বোরখা বা পর্দ্দা প্রথাকে সমর্থন করে না। এবং সেই সময়েই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোরায়া নিজের বোরখা সরিয়ে দেন। সাথে সাথে জনতার মধ্যে অসংখ্য নারীও নিজেদের বোরখা ছুঁড়ে ফেলেন। দেশের মৌলবীরা এবং লোয়া জির্গা আমানুল্লাহ্‌র অনেক নীতিরই তীব্র বিরোধিতা করেন এবং একসময়ে আমানুল্লাহ্‌কে দেশছাড়া হতে হয়। কিন্তু তারপরেও আফগানি রাষ্ট্রনেতারা বিভিন্ন সময়ে নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে অনেক নীতির প্রণয়ন করেছেন। ১৯৩০ এবং ১৯৪০ দশকে নারীর শিক্ষা রাষ্ট্রের মদতে অনেকটা এগিয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে দেশের নারীরা ভোটদানের অধিকার লাভ করার পাশাপাশি সক্রিয় ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ফলস্বরুপ ১৯৭০-এর দশকে দেশের ৪০% ডাক্তার, ৭০% শিক্ষক ও সিভিল সার্ভিসে ৩০% মহিলা ছিলেন। এই চিত্রটি রাজধানী কাবুলে যতটা ছিল, গ্রামাঞ্চলে তখনও তেমন ছিল না। কিন্তু মস্ত আশা ছিল। একটা দৃঢ় প্রত্যয় ছিল – পরিবর্তনের, উন্নতির, প্রগতির।

সেই আশা, সেই প্রত্যয়ে কঠিন আঘাত হানল বিদেশী শক্তি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত রাশিয়ার (পরবর্তীতে পাকিস্তান আর ইরানের ভূমিকাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য) রেষারেষির জাঁতাকলে পড়ে গেল দেশটা। রাশিয়া আফগানিস্থান আক্রমণ করে ১৯৭৯ সালে কম্যুনিস্ট শাসন জারি করল। ততদিনে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মদতে ‘মুজাহিদিন’ও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তালিবানের জন্মের পিছনে রাশিয়ার আফগানিস্থান দখলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যতটা দায়ী, ততটাই, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেজিন্সকির ভাষায়, “রাশিয়াকে তাদের ভিয়েতনাম” উপহার দেবার ছল-কৌশল ছিল

সোভিয়েত শক্তি আফগানিস্থান দখলের পর বেশ কিছু এমন নীতি প্রণয়ন করে যার ফলে সাধারন মানুষের মধ্যে তাদের সামান্যতম গ্রহণযোগ্যতাও গড়ে ওঠে না। জোর করে মহিলাদের বোরখা ব্যবহার বন্ধ করে বাড়ির বাইরে এনে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে সামিল করা আখেরে তালিবানদেরই মদত জোগায়। আর তাই এক দশক পরে মুজাহিদিনরা সোভিয়েত শক্তিকে যখন দেশ উৎখাত করে এবং ১৯৯৬ সালে তালিবান দেশের ক্ষমতা নেয়, নারী-অধিকার এক ধাক্কায় কয়েকশো বছর পিছনে ফেলে দেওয়া হয়। এই কিছুদিন আগে নাজিবার ক্ষেত্রে যা ঘটলো, তখনও গোটা বিশ্ব, হয়ত বা চোখে ভীতি নিয়েই, এমন নানা কীর্তি দেখতে শুরু করল। এই মাসেই, আমরা জানি, আফগানিস্থানের নারী বিষয়ক মন্ত্রী হানিফা সফিকে বোরখা না পরার কারনে হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ফোজিয়া কুফি নামক মহিলা, ইতিমধ্যেই যার উপর একাধিকবার তালিবানরা হত্যার চেষ্টা চালিয়ে ফেলেছে, তার “দ্য ফেভার্ড ডটার” বইয়ে একটা বিষয়ের স্পষ্ট উল্লেখ করছেন যে বহির্বিশ্বের এই ভাবনা যে ‘পশ্চিমী দুনিয়া ২০০১ সালে আফগানিস্থানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে’ আসলে এক বিরাট ধাপ্পা। তা অসত্য। তা ভ্রান্ত। তেমনই এক বিরাট ভ্রান্ত ধারনা হল যে আফগানিস্থানে নারী-অধিকারের ভাবনাও আদতে পশ্চিমের অবদান।

"প্রগতিশীল পশ্চিমী দুনিয়া", "ইসলাম" আর তার সাথে 'ধরে নেওয়া' আদতে রাজনৈতিক সমীকরন, "মধ্যযুগের অন্ধকূপ"এ পড়ে থাকা "ইসলামিক স্টেট"... একটু ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে তথ্যগুলো মগজে ঢুকিয়ে তারপর আরো একবার এই শব্দ বা শব্দবন্ধগুলো নিয়ে নাড়াঘাটা করলে হয় না? প্রগতিশীল পশ্চিমী দুনিয়া কোন্‌ প্রগতির কথা বলে? বৃটেন-আমেরিকা প্রভৃতির উন্নতি, প্রগতির যে ঝক্‌ঝকে চিত্র প্রতিনিয়ত ABC BBC CBC ইত্যাদি (নানা বহুজাতিক সংস্থার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আর্থিক মদতে চলা) চ্যানেলগুলোয় ফুটে ওঠে, সেই উন্নয়নের পিছনে যে আরেকটা অত্যন্ত করুন অথচ নৃশংস ও লোলুপ চিত্র দৃশ্যমান হতে পারছে না, সেটা ভুলে থাকব কি করে? শুনেছি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন এক বছরে যতটা খনিজ তেল নিজের উদরস্থ করে, গোটা আফ্রিকা মহাদেশের সমস্ত দেশ মিলে তার চেয়ে কম তেল ব্যবহার করে/করতে পারে। আর তাই সৌদি আরবের সাথে কারো গলায় গলায় সখ্যতার কারন বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। চমস্কির ওই বক্তব্যর সার – ধর্ম নয়, বানিজ্য – তাও সহজেই বোধগম্য হয়।

এই অন্তর্জাল ঘেঁটেই জানতে পারলাম নানান দেশ নাজিবার ঘটনার যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তার মধ্যে সব চেয়ে বেশী ধিক্কার জানানো, বা আফগানী নারীর অধিকার নিয়ে মানবিক চিন্তা প্রকাশ - সেটা ঘটেছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। বিবৃতিগুলি দিয়েছেন হিলারি ক্লিন্টন।


'আমিষ': ভালবাসার বিনির্মাণ

"আমিষ" ভালবাসার বিনির্মাণ   শুভ্রদীপ দাশগুপ্ত       আমিষ (২০১৯, অসমিয়া) রচনা ও নির্দেশনাঃ ভাস্কর হাজারিকা     অবশেষে ছবিটি দেখ...