এক প্রণতি, আর এক মিনারার গল্প
ক্ষিদ্দা! ক্ষিদ্দা! তুমি কি শুনছ?
পিংলা। মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর মহকুমার এক ছোট্ট গ্রাম। সেই গ্রামেই থাকেন সুমন্ত নায়েক। পেশায় বেসরকারী বাস চালক। পেশায় বেসরকারী বাস চালক সুমন্ত নায়েকের পরিবার ঠিক আর পাঁচটা বেসরকারী বাস চালকের পরিবারের মতই চলছিল। সেই অজস্র অতি সাধারন পরিবারের একটা, যেখানে আর্থিক দুর্ভাবনা জীবনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। এই অতি সাধারন ঘরেই ১৯৯৫ সালের ৬ এপ্রিল জন্ম প্রণতির। বাড়ির আর্থিক দুরবস্থা। অতি সাধারন দিনযাপন। কিন্তু, মানুষের মন আর ইচ্ছা এক অদ্ভূত বেয়ারা ব্যাপার। সেই যাপনের মধ্যেও কি এক আশ্চর্য উপায়ে একেবারে ছোট্ট বয়েস থেকেই বাচ্চা মেয়েটির দুর্মর আকর্ষণ জিমন্যাস্টিক্সের প্রতি।


এক অদম্য জেদ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে প্রণতিকে
অতি সাধারন গ্রামের অতি সাধারন বাড়ির মেয়েটির ভিতরটুকু কিছুতেই সেই সাধারনের গন্ডিতে আটকে থাকতে চায় নি। ক্রমাগত ছটফট করতে থেকেছে। এক অদম্য ইচ্ছা, জেদ তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আর সেই তাড়নাই আজ তাকে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়ার অঙ্গনে। হ্যাঁ, সেই পিংলার এক বাসচালকের মেয়ে প্রণতি নায়েকের দিকেই আজ গোটা দেশ তাকিয়ে। হয়ত আর কয়েকটা দিন পরে, বিশ্বের সেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়ার অঙ্গন, অর্থাৎ ২০২০ টোকিও অলিম্পিক্সে তাঁর অংশ নেবার মুহূর্তে সারা বিশ্বও তাকিয়ে থাকবে তার দিকে। আর বিস্মিত হবে।
তবে এই বিস্ময়-কন্যার হয়ে ওঠার পেছনে যে মানুষটির সবচেয়ে বড় অবদান আছে, সেই মিনারা বেগমের কাহিনীও কম বিস্ময়ের না। আজ বরং সেই নেপথ্যে থাকা মানুষটিকে নিয়ে দু’চার কথা হোক।
চন্দননগরে জন্ম মিনারা বেগমের। মিনারার যখন আট বছর বয়স, সেই সময় চন্দননগরে জিমন্যাস্টিক্সের এক আসর বসে। সেই প্রথম জিমন্যাস্টিক্সের সাথে তার পরিচয়। আর, যাকে বলে, প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাওয়া। তবে, এই প্রেমের শুরুর দিকটা, অজস্র নভেল-নাটক-গল্পের মতই কিছুটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল বই কি। চন্দননগরে বাড়ির কাছে এক জিমন্যাস্টিক্স ক্লাব চালু হতেই ছোট্ট মিনারা সেখানে ভর্তি হবার আব্দার শুরু করেন। কিন্তু বেঁকে বসলেন মিনারার মা। প্রথমত একটি মেয়ের ‘ওসবের’ মধ্যে যাওয়া। তাছাড়া, জিমন্যাস্টিক্স মানেই শরীরের সমস্ত হাড়গোড়ের দফারফা অবস্থা আর সারা জীবন সেই নিয়ে ভোগান্তির একশেষ। এই সমস্ত প্রচলিত ধারনার কারনে শুরুটা মোটেই সহজ হয় নি মিনারার। সৌভাগ্যক্রমে মিনারার বাবা ছোট মেয়ের ইচ্ছাকে সমর্থন করেন, অনেক বুঝিয়ে রাজি করান মিনারার মাকে। আর এভাবেই, আজ থেকে বেশ কয়েক দশক আগের কোনো এক সকালে আরো প্রায় শতখানেক ছেলেমেয়ের মত মিনারাও গিয়ে হাজির হয় সেই ক্লাবের সামনে। সবারই ইচ্ছা, ক্লাবে ঢুকব, জিমন্যাস্টিক্স শিখব।
কিন্তু, বাইরে থেকে কিছু ভালো লাগা এক ব্যাপার, আর ভিতরে ঢুকে সেই প্রক্রিয়ার সাথে নিয়মিত ভাবে যুক্ত হওয়া আরেক বিষয়। জিমন্যাস্টিক্সের মোহে সেই যে শতাধিক ছেলেমেয়ে এসে ভীড় করেছিল ক্লাবে, আস্তে আস্তে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। কারণটা সহজেই অনুমেয়। জিমন্যাস্টিক্সের অনুশীলনে যেই পরিমাণ পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতা, ত্যাগ এবং শৃঙ্খলের প্রয়োজন, খুব বেশী জন সেটার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি। কিছু সময়ের মধ্যে দেখা গেল, মাত্র গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে রয়ে গেছে সেই ক্লাবে। মিনারা অবশ্যই তাদের একজন।
প্রথমবার জাতীয়স্তরে অংশগ্রহণ করেন যখন, মিনারার বয়স মাত্র দশ বছর। এই কৃতীত্ব তাঁকে আনন্দবাজার পত্রিকার শিরোনামে নিয়ে আসে। আর সেই সাথে বদলে যায় তাঁর মায়ের দৃষ্টিভঙ্গী। এরপর থেকে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে কোনোদিন কোনো কারনে মিনারা যদি প্র্যাক্টিসে যাবার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করত, স্বয়ং তার মা তাকে ঠেলে পাঠাতেন। মনে রাখা দরকার, এ পোড়ার দেশে হাতে গুনে এক-দুই ধরনের খেলার বাইরে কোনো খেলাকেই সেভাবে স্বীকৃতি দেয় না মানুষ। আর আমরা যেই সময়ের কথা বলছি, অর্থাৎ মিনারা বেগমের শুরুর সেই দিনগুলোর সময়, তখন জিমন্যাস্টিক্সের সামান্যতম খ্যাতিও ছিল না। অর্থও তথৈবচ। ফলত, ফ্লোর এক্সারসাইজ করতে হত শক্ত জমি বা খোলা ঘাসের উপর। তবে এই সমস্ত প্রতিকূলতা মুহূর্তের জন্যও স্থিতপ্রজ্ঞ মিনারাকে টলাতে পারে নি।
সময়ের সাথে সাথে মিনারা একের পরে এক জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকেন। ঘুরতে থাকেন এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে। এভাবেই তিনি চন্দননগর থেকে এসে পড়েন কলকাতার ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে। চন্দননগরের বাড়ি থেকে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রর দূরত্ব নেহাত কম না। তবে, প্রতিদিন অতটা সময় ধরে অতটা পথ যাতায়াতের ধকল নিয়ে মিনারার বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা ছিল না। পরিবর্তে সঠিক ভাবে জিমন্যাস্টিক্স শেখার সুযোগ মিলছে যে। আর সাথে চলছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ।
সালটা ১৯৮০। আর দুই বছর পর এই দেশেই অনুষ্ঠিত হতে চলে চলা এশিয়াডের প্রস্তুতির জন্য এক জাতীয় স্তরের ক্যাম্পের আয়োজন করা হল। অসম্ভব উত্তেজনার সাথে অধীর আগ্রহে শুরু হল মিনারার প্রহর গোনা; কবে সেই ক্যাম্প থেকে ডাক আসবে! কবে সেই ক্যাম্পে গিয়ে জাতীয় স্তরে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে ছিনিয়ে নেবে এশিয়াডের মত প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার সুযোগ! অপেক্ষা চলতে থাকল, অথচ আশ্চর্য ভাবে মিনারার কাছে সেই ডাক এসে পৌঁছল না। খুবই হতাশ হলেন মিনারা। নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগটুকুও মিলল না! হতাশ হলেন, ক্ষোভ হল, কিন্তু ভেঙ্গে পড়লেন না। ভেঙ্গে পড়লেন না, কেননা একজন প্রকৃত ক্রীড়াবিদের মতই কোনো প্রতিকুল অবস্থাতেই ভেঙ্গে পড়তে শেখেন নি যে তিনি! বরং শুরু হল আরো কঠোর অনুশীলন। এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্রীড়া বিভাগ থেকে তাকে একটি স্পোর্টস্ স্কলারশিপ দেওয়া হল, যার সুবাদে পাটিয়ালায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্পোর্টস্ থেকে তিনি একটি কোর্স করার সুযোগ পেলেন। সেই কোর্স শেষ করার পাশাপাশি মিনারা এক আন্তর্জাতিক বিচারকের কোর্সও করলেন। আর, কপালের এমনই ফের, তিনি সেই ১৯৮২ এশিয়াডেরই একজন বিচারক হয়ে গেলেন, যেখানে ক্রীড়াবিদ হিসেবে অংশ নেবার সুযোগ থেকে তাকে অন্যায় ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

১৯৮২ এশিয়াড শেষ হবার পর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্পোর্টস্ তাকে একজন জিমন্যাস্টিক্স প্রশিক্ষক হিসেবে চাকরির প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হয়ে যান। এভাবেই একজন দক্ষ জিমন্যাস্ট থেকে মিনারা হয়ে উঠলেন জাতীয় স্তরের এক জিমন্যাস্টিক্স প্রশিক্ষক। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশিক্ষক হিসেবে মিনারা একের পর এক কৃতীত্বের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। এক সময় তাঁর বদলি হয় কলকাতায়। আর, এর সাথে সাথেই শুরু হয় মিনারা বেগমের বর্ণময় জীবনের আরেক নতুন অধ্যায়।

গুরু-শিষ্যা
প্রশিক্ষক হিসেবে কলকাতায় কাজ শুরু করে মিনারার চোখে পড়েন প্রণতি নায়েক। প্রণতি তখন সবে আট বছর বয়সী এক বাচ্চা মেয়ে। কিন্তু জহুরীর চোখ ঠিক আসল রত্নটিকে চিনে নিয়েছিল। শুরু হয় প্রণতিকে নিয়ে এক নতুন লড়াই। অভাবী ঘরের মেয়েটিকে শুধু যে জিমন্যাস্টিক্সের প্রশিক্ষণ দিলেই চলবে না। বাড়িতে অভাব। কলকাতা শহরে থেকে জিমন্যাস্টিক্সের প্রশিক্ষণ চলবে কী ভাবে? খাওয়া-পরা, প্রতিদিনের খরচ, কে জোগান দেবে সে’সবের? মতি নন্দীর কোনো এক গল্পের পাতা থেকে উঠে আসা চরিত্র যেন! প্রণতির আর্থিক দায়ভার গ্রহণ করে নিলেন মিনারা নিজেই। শুরু হল এক নতুন পথচলা।
২০০৮ সালের আন্তর্জাতিক জুনিয়র এশিয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে প্রণতির জীবনের প্রথম কোনো সত্যিকারের বড় ময়দানে পদার্পণ। এর পর ২০১৪ সালে কমনওয়েলথ গেমসের জন্য দীপা কর্মকারের পাশাপাশি নির্বাচিত হলেন প্রণতি। যুক্তি অনুযায়ী জিমন্যাস্টদের সাথে যেই দুই জন প্রশিক্ষকের যাওয়া স্বাভাবিক হত, তাঁরা হলেন বিশ্বেশ্বর নন্দী (দীপা কর্মকারের প্রশিক্ষক) আর মিনারা বেগম (প্রণতির প্রশিক্ষক)। অথচ, মিনারাকে অবাক করে দিয়ে তার বদলে পাঠানো হল অন্য এক মহিলা প্রশিক্ষককে। যার কারন আজও মিনারার কাছে স্পষ্ট না।

দীপা কর্মকারের সাথে প্রণতি
অবশেষে ২০১৪ সালের এশিয়ান গেমসে মিনারা আর বিশ্বেশ্বর নন্দী প্রশিক্ষক হিসেবে যাবার সুযোগ পান। ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপেও তাঁরা দু’জন যান। কিন্তু ২০১৮ সালের এশিয়াডে আবার তাকে হাস্যকর ভাবে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। হাস্যকর, কেননা, যেই চারজন জিমন্যাস্ট সেই প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়, তার মধ্যে দু’জনই মিনারার ছাত্র-ছাত্রী। আবারও অবাক হলেন মিনারা, কিন্তু আবারও কোনো কারন খুঁজে পেলেন না এই বঞ্চনার।
যেই ছাত্রীকে প্রায় সবদিক দিয়ে আগলে রেখে, অনেক যত্নের সাথে গড়ে তুলেছেন, সেই প্রণতির সাথে আবার তিনি যাত্রা করার সুযোগ পান ২০১৯ সালের এশিয়ান আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিক্সে। মোঙ্গোলিয়ার উলানবাতারে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় প্রণতি জিতে নেন ব্রোঞ্জ মেডেল। আর আজ সেই ব্রোঞ্জ মেডেলই তাকে সুযোগ করে দিয়েছে আর কিছুদিন পরে শুরু হতে চলা টোকিও অলিম্পিক্সে। প্রণতির অলিম্পিক্সে সুযোগ করে নেওয়া নিঃসন্দেহে আমাদের প্রত্যেকের কাছে অত্যন্ত আনন্দের খবর। কিন্তু, দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই আনন্দ নিখাদ হয়ে উঠতে পারছে না। কারন, আরো একবার, হ্যাঁ, আরো একবার অন্যায় ভাবে সমস্ত যুক্তির বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষকের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন স্বয়ং মিনারা। আক্ষরিক অর্থে নিজের হাতে তিলে তিলে গড়ে তোলা প্রিয় ছাত্রী যখন সারা দেশের গর্ব হিসেবে বিশ্ব ক্রীড়ার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ময়দানে নামবে, নিজের ঘরে টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসেই সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্তের সাক্ষী হতে হবে গুরুকে।
ক্ষিদ্দা! ক্ষিদ্দা! তুমি কি শুনছ?

স্বপ্নের উড়ান
এগিয়ে চলুক প্রণতির এই জয়যাত্রা

No comments:
Post a Comment